বিশ্ব বাঘ দিবস আজ

আপডেট : July, 29, 2017, 11:33 am

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ শিকার ও দেহাবশেষ পাচার, আবাসস্থল ধ্বংস করে রাস্তাঘাট-বসতবাড়ি ও কলকারখানা নির্মাণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ ৭ কারণে বাংলাদেশসহ বিশ্বে বাঘের সংখ্যা কমছে। ওই সব কারণে ভালো নেই সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারও। গত ৫ বছরে এ বনে বাঘের সংখ্যা কমেছে ৩৩৪টি। সর্বশেষ হিসাবে সুন্দরবনে বাঘ আছে ১০৬টি। অথচ ২০১০ সালে ছিল ৪৪০টি।

বাঘের আবাস আছে পৃথিবীতে এমন দেশ ১৩টি। এর মধ্যে বাংলাদেশসহ ৯টি দেশেই বাঘের নিরাপদ আবাসস্থল গড়ে উঠতে পারেনি। ২০১০ সালের হিসাবে, ১৩ দেশে ৪ হাজার ১৭১টি বাঘ ছিল। ২০১৫ সালের বিশ্বে বাঘ পাওয়া গেছে ৩ হাজার ৮৯০টি। সেই হিসাবে ৫ বছরে ২৮১টি বাঘ কমেছে। অথচ রাশিয়ার সেন্টপিটার্সবার্গ শহরে অনুষ্ঠিত ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব বাঘ সম্মেলনে ২০২২ সালের মধ্যে পৃথিবীতে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব বাঘ দিবস। ওই ১৩টি দেশ ২০১০ সাল থেকে প্রতি বছর দিবসটি পালন করে আসছে। দিবস উপলক্ষে আজ বাগেরহাটে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। একই মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবসহ স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এতে উপস্থিত থাকবেন।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ৫ বছরে বিশ্বে বাঘ সবচেয়ে বেশি কমেছে বাংলাদেশে, ৩৩৪টি। তবে সরকারি উদ্যোগ ও শুভ পদক্ষেপে গত কয়েক বছরে মানুষ ও বাঘের সংঘাত আগের চেয়ে অনেক কমেছে। এ কারণে পিটুনিতে বাঘের মৃত্যু যেমন কমেছে, তেমনি বাঘের আক্রমণে মানুষের মৃত্যুও হ্রাস পেয়েছে।

বন সংরক্ষক জাহিদুল কবির জানান, সুন্দরবনের বাঘের সুষ্ঠু সংরক্ষণ ও প্রবৃদ্ধির প্রধান অন্তরায়গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। অবাধ বিচরণ ও আবাসস্থল নির্বিঘ্ন করতে নেয়া হয়েছে যথাযথ ব্যবস্থা। বাঘের নিরাপদ প্রজনন পরিবেশ তৈরির কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বাঘ শুমারি শেষ হলে ফলাফল পাওয়া যাবে।

গত ৫ বছরে বিশ্বে বাঘের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে কম্বোডিয়া চিহ্নিত হয়েছে। বাংলাদেশ প্রাণিবিজ্ঞান সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বনবিভাগের সাবেক উপপ্রধান বন সংরক্ষক ড. তপন কুমার দের মতে, ২০১০ সালে কম্বোডিয়ায় ৫০টি বাঘ ছিল। কিন্তু ২০১৫ সালে দেশটি একেবারেই বাঘশূন্য হয়ে গেছে। অপরদিকে চীনে ২০১০ সালে বাঘ ছিল ৪৫টি। ২০১৫

সালের হিসাবে পাওয়া গেছে মাত্র ৭টি। নিরাপদ আবাসস্থলের জন্য রাশিয়া, ভারত, নেপাল এবং ভুটানে ৫ বছরে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে। মিয়ানমারে বাঘের সংখ্যা অপরিবর্তিত আছে।

ড. তপন কুমার দে তার এক লেখায় উল্লেখ করেন, বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এখনও সনাতনী ওষুধ, শ্যাম্পু ও টনিকের জন্য বিশাল বাজার আছে চীনসহ কয়েকটি দেশে। এ কারণে বাঘ শিকারের প্রতি এক শ্রেণীর মানুষের আগ্রহ আছে। তারা বাঘ শিকার ও দেহাবশেষ (চামড়া, হাড় ইত্যাদি) পাচার করে। অপরদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঘ সমৃদ্ধ বনাঞ্চল ধ্বংস করে গড়ে উঠছে ভারি শিল্প-কলকারখানা, রাস্তাঘাট, জনবসতি, হাট-বাজার ইত্যাদি। বাঘ সমৃদ্ধ বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে যানবাহন ও নৌ চলাচল বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘের আবাসস্থল নির্বিঘ্ন করা না গেলে সংরক্ষণ, প্রজনন প্রক্রিয়া ও প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়ে বিলুপ্তির দিকে যাবে। যদিও বনবিভাগ বলছে, সুন্দরবনে বাঘের অবাধ বিচরণ ও যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব বাধা চিহ্নিত করে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এর সুফলও পাওয়া গেছে। গত ২ বছরে বাঘের আক্রমণে কোনো মানুষ মারা যাননি। গত বছর মানুষের হাতে কোনো বাঘ মরেনি। অবশ্য ২০১২ ও ২০১৩ সালেও মানুষের হাতে কোনো বাঘ মরেনি। পরের ২ বছর ২টি করে ৪টি বাঘ মানুষের পিটুনিতে মরেছে। বাঘ মৃত্যুর আরেকটি কারণ হচ্ছে বার্ধক্য। তবে ২০১৩ সালের পর এখন পর্যন্ত বার্ধক্যের কারণে কোনো বাঘ মরেনি। ২০১১ ও ২০১২ সালে পরপর ২ বছরে ৭টি বাঘ এ কারণে মারা গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার বাঘের সমীক্ষা পুনরায় শুরু করেছে। একটি প্রকল্পের অধীনে গত বছরের শেষের দিকে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা অঞ্চলে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘ গণনা হয়েছে। সেই হিসাব বর্তমানে চূড়ান্তকরণ চলছে।

এর আগে ২০১৫ সালের ক্যামেরা পদ্ধতিতে বাঘ গণনার জরিপ প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১০৬টি। ২০০৪ সালে বন বিভাগ এনএনডিপির সহায়তায় প্রথমবারের মতো বাঘের পায়ের ছাপ গুণে বাঘের সংখ্যা নির্ধারণ করেছিল ৪৪০টি। ২০০৬ সালে ক্যামেরা পদ্ধতিতে গণনা করে ২০০টি বাঘ পাওয়া যায়। এতে দেখা যায়, গত ১১ বছরে বাঘের সংখ্যা কমতে কমতে অর্ধেকে নেমে এসেছে। অথচ ভারতে ৫ বছরে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে। ২০১০ সালে দেশটিতে বাঘ ছিল ১৭০৬টি, ২০১৫ সালে তা দাঁড়ায় ২২২৬টিতে।

Facebook Comments