ব্যাংকে চুরি সব দেশেই হয়- অর্থমন্ত্রী

জুন ০৩ ২০১৭, ১৪:১৩

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, নতুন ভ্যাট আইন-২০১২ বাস্তবায়ন হলেও দ্রব্যমূল্য কোনোভাবেই বাড়বে না। বরং কমবে। কেননা নিত্যপণ্যে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকে যাদের লাখ টাকার ওপরে থাকে তারা সম্পদশালী। এ জন্যই আবগারি শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। তারা আমাদের দেশের তুলনায় সম্পদশালী। ফলে তারা বাড়তি ভারটা বহন করতে পারবেন, সমস্যা হবে না। তার মতে, সরকারের বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা বেড়েছে। এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা অবান্তর। কেননা গত পাঁচ বছরে ৯১ হাজার কোটি টাকা থেকে ৩ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে—এটাই তার প্রমাণ। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বেই। কেননা প্রস্তাবিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে এ জন্য কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার দেওয়া এই বাজেটে কোনো দুর্বলতা নেই। সারা বাজেটই উজ্জ্বল বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাজেট মানেই উচ্চাভিলাষ। আর তার জীবনে দেওয়া শ্রেষ্ঠ বাজেট হলো এবারের বাজেটটি। বাজেট ঘোষণার দিনে গৃহস্থালির গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে এমন তথ্য ঠিক নয়। সেটা আগের সিদ্ধান্ত। ২০১৮ সাল থেকে গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণ করা হবে আন্তর্জাতিক নিয়মে। উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, জনকল্যাণের জন্য ঐকমত্যের দরকার। গতকাল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তাকে সহযোগিতা করেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান। মঞ্চের পেছনের সারিতে বসে প্রশ্নোত্তর পর্বে আরও সহায়তা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান। উপস্থিত ছিলেন অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন, পরিকল্পনা সচিব মো. জিয়াউল ইসলাম এবং ইআরডি সচিব কাজী শফিকুল আজম। দর্শক সারিতে উপস্থিত ছিলেন একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সুরাইয়া বেগম ছাড়াও ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা। অনুষ্ঠানের শুরুতে অর্থমন্ত্রী বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য বাজেটে ৫৪ দশমিক ১৭ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জেন্ডার সমতায় ২৮ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একটা জাতীয় পেনশন স্কিম করার পরিকল্পনা রয়েছে। এবারের বাজেটে বৈদেশিক সহায়তার লক্ষ্য অনেক বাড়ানো হয়েছে। এটা যৌক্তিক। কেননা আমরা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাচ্ছি। কিন্তু আমরা পুরোটা ব্যবহার করতে পারছি না। কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে। এগুলো বাড়বেই। সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্য বাড়ানো হয়েছে। এটাও যৌক্তিক। ব্যাংকে যেন চাপ না পড়ে সে জন্য এমন পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ খাতের সুদের হার পুনর্বিন্যাস করা হবে খুব শিগগিরই। সর্বোচ্চ বরাদ্দের বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষা খাতে কখনই সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয় না। এটা ঠিক নয়। সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে। প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি বলেন, নতুন ভ্যাট আইন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের স্পর্শ করবে না। ফলে পণ্যের দাম বাড়বে না। বর্তমান সরকার অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে সমতা অর্জনে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। দারিদ্র্য বিমোচনে সম্প্রতি যে অগ্রগতি হয়েছে, সেখানে হতদরিদ্রের হার বেশি। অর্থাৎ দরিদ্র মানুষ দারিদ্র্য সীমার ওপরে বেশি উঠে এসেছে।

অনেকগুলো পণ্য ও সেবায় ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা খাতে বৈষম্য নিরসন করা হবে অথচ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ রয়েছে, যা নতুন আইনে ১৫ শতাংশ হবে। তাহলে শিক্ষা খাতে কীভাবে  বৈষম্য নিরসন করবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকার শিক্ষায় সমতা আনার বিষয়ে কাজ করছে। ইংলিশ মিডিয়ামে অতিরিক্ত ভ্যাট আরোপের ফলে কোনো ধরনের বৈষম্য হবে না। অর্থমন্ত্রী বলেন, ভিক্ষুক পুনর্বাসনের জন্য প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এখন যারা ভিক্ষা করেন তারা অভাবে নয় স্বভাবে করেন। এদের নির্মূল করা সম্ভব নয়। তবে ভিক্ষুকের সংখ্যা অনেক কমেছে। চালের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, বাজারের প্রকৃত চিত্র আপনাদের বক্তব্যে বা লেখায় উঠে আসে না। আমাদের স্বভাব হলো বাড়িয়ে বলা। বাজারে এখন মোটা চাল ৪০-৪৫ টাকায় বিক্রি হয়— এমন তথ্য সঠিক নয় বলে তিনি দাবি করেন। আর নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হলে চালের দাম

বাড়বে না, উল্টো কমবে বলে তিনি মনে করেন। এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী বলেন, সিলেট অঞ্চলের সাত জেলায় দুর্যোগ হওয়ায় ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে ১৫ লাখ টন শস্য নষ্ট হয়েছে। ফলে চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। বোরো উঠলে চালের বাজার আবারও স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে জানান মন্ত্রী। বাজারে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে এমন তথ্য সঠিক নয় এবং সাংবাদিকরা বাড়িয়ে বলেন কৃষিমন্ত্রীও অভিযোগ করেন। একই প্রসঙ্গে শিল্পমন্ত্রী বলেন, বাজারে কোনো চালের সংকট নেই। এ কথা সত্য। তবে দাম কিছুটা বেড়েছে। এখানে এক শ্রেণির ব্যবসায়ীর হাত থাকতে পারে। অতি উৎসাহী কিছু লোক/ব্যবসায়ী রোজার আগে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ে ধীরগতির প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ অনেক বেশি। এ জন্য প্রবাসীরা ভিন্ন পথে রেমিট্যান্সের অর্থ দেশে পাঠায়। প্রকৃতপক্ষে রেমিট্যান্স কমেনি। এ জন্য রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণে বাজেটে আবারও ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, এতে মূলত জনগণের করের টাকার অপব্যবহার হচ্ছে কিনা-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ব্যাংক খাতে জালিয়াতি ও চুরিচামারি সব সময় হয়। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে লুটপাট হচ্ছে। আগে সরকারি ব্যাংকগুলোতে হতো, এখন বেসরকারি ব্যাংকে হচ্ছে’ এই অ্যাজামশন (ধারণা) আমাদের মানতে কষ্ট হচ্ছে। কারণ ব্যাংক খাতে জালিয়াতি হয়, চুরিচামারি হয়। সব সময় হয়, সব দেশেই হয়। জালিয়াতি হয় তো বা কোথাও একটু বেশি হয়। এখন আমরা সেটা একটু কমাতে পেরেছি। ব্যাংক লুটপাট হচ্ছে বলে আমার মনে হয় না। তবে দু-একটি ব্যাংকে সমস্যা আছে। সমস্যাগুলো সমাধানেরও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ব্যাংক খাত নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, জনগণের টাকা নিয়ে সরকারি ব্যাংকগুলোকে দেওয়া হয় এ কথা সত্য। তবে দেশের উন্নয়নে এসব ব্যাংকের ভূমিকা রয়েছে। কারণ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার এসব ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে থাকে। কর্মসংস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি যদি এক শতাংশ বাড়ে, তাহলে দেড় লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়। এই হিসাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়লে আমাদের কর্মসংস্থানের ঘাটতি থাকবে না। প্রস্তাবিত নতুন বাজেটের কোনো দুর্বলতম দিক আছে কিনা- এমন প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বাজেট হলফ করে বলতে পারি। এই বেস্ট বাজেটের জন্য যে পরিশ্রম করা দরকার, তা আমি করেছি। বাজেট  তৈরির সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তারাও যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন। বাজেটের কোথাও দুর্বলতা আছে বলে আমার মনে হয় না। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয়নি এ কথা সঠিক নয়। তেলের দাম কমানো হয়েছে। তবে যে পরিমাণ কমানোর দরকার ছিল, হয় তো সে পরিমাণ কমানো হয়নি। এ বিষয়ে আমি আর কোনো মন্তব্য করব না। কারণ বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সঞ্চয়পত্রের বিষয়ে তিনি বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার সমন্বয় করা হবে। আগে অনেক দিন পরপর এ সুদের হার সমন্বয় করা হতো। এখন এটি প্রতি বছর অন্তত একবার সমন্বয় করা হবে। কারণ বাজারে সুদ হারের থেকে সঞ্চয়পত্রের সুদ হারে অনেক বৈষম্য হওয়াটা যৌক্তিক নয়। তবে অল্প ব্যবধান থাকবে। বাজারে ৭ শতাংশ আর সঞ্চয়পত্রে ১১ শতাংশ হবে এটা ঠিক নয়। বর্তমানে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে অথচ প্রতিদিনই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে-এ প্রসঙ্গে মতিয়া চৌধুরী বলেন, আগে বিদ্যুৎই ছিল না। এখন তো আছে। ফলে হিসাবটা এখন সবাই করে। কখন বিদ্যুৎ থাকে। কখন লোডশেডিং হয়। তবে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে।   অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে বিনিয়োগের মোট ৮০ ভাগ বেসরকারি খাতের। বাকি ২০ ভাগ সরকারি খাতের। বর্তমানে বেসরকারি বিনিযোগের চিত্র পাল্টেছে। আগামী অর্থবছরে ব্যক্তি খাতের এই বিনিয়োগ ২৩ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। আর সরকারি খাতের বিনিয়োগ ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। দেশে বর্তমানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক ঘাটতি রয়েছে কিনা-এমন প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি তিনি। কালো টাকার প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটা কোনো সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়নি। এটা একটা আইন আছে। সে আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে জরিমানা দিয়ে অনেকেই অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করে থাকেন।

 

 

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>