‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙা ভইরা লইয়া যায়’

মে ২৮ ২০১৭, ১১:৪৩

ঐতিহ্য আর খানদানি ইফতারি মানেই পুরান ঢাকার ইফতার সামগ্রী। মোগল আমলের ঐতিহ্যের ছাপ ও ছোঁয়ার এসব ইফতারি কালক্রমে ঢাকার সব এলাকায় ছড়িয়ে পড়লেও এখনো স্বাতন্ত্র্য বিদ্যমান পুরান ঢাকাতেই। প্রতি বছরের মতো এবারও সরগরম হয়ে উঠবে পুরান ঢাকার চকবাজার, নাজিমউদ্দিন রোড, চক সার্কুলার রোড, নর্থ সাউথ রোড, শাহী মসজিদ রোডসহ বিভিন্ন এলাকা। ইতোমধ্যে সকাল থেকেই শত শত দোকান তৈরি হচ্ছে রকমারি ইফতারির পসরা সাজাতে। একেক দোকানে একেক ধরনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ইফতারি পণ্যের সমাহারে পুরান ঢাকা  সাজবে বৈচিত্র্যময়তায়। সেখানে এই রকমারি ইফতার বাজারের একটি জনপ্রিয় আইটেম ‘বড় বাপের পোলায় খায়’।

নামকরা তথা ঐতিহ্যময় একটি ইফতারি পণ্য এটি। এর ঐতিহ্য প্রায় ৭৭ বছরের। এটি তৈরিতে ডিম, গরুর মগজ, আলু, ঘি, কাঁচা ও শুকনো মরিচ, গরুর কলিজা, মুরগির মাংসের কুচি, মুরগির গিলা কলিজা, সুতি কাবাব, মাংসের কিমা, চিড়া, ডাবলি, বুটের ডাল, মিষ্টি কুমড়াসহ ১৫ পদের খাবার আইটেমের সঙ্গে ১৬ ধরনের মসলা মিশিয়ে ৩১ পদের যে মিশ্রণ তৈরি হয় তার নামই ‘বড় বাপের পোলায় খায়। ‘ একটি বড় গামলায় এই ৩১ ধরনের খাবারসামগ্রী দুইহাতে ভালোভাবে মাখিয়ে তারপর ঠোঙায় করে বিক্রি করা হয়। বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরিকৃত এই খাবারটি কিনতে ছোট-বড় সব বয়সী রোজাদারের মধ্যে রীতিমতো কাড়াকাড়ি লেগে যায়। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এর স্বাদ নতুন প্রজন্মের কাছেও পৌছে গেছে। ছড়িয়ে গেছে এই মুখরোচক খাবারটির গল্প।

ঐতিহ্যবাহী এই ইফতারি আইটেমটি নিয়ে একটি ছড়ারও প্রচলন আছে, আর তা হলো ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙা ভইরা লইয়া যায়’। পুরান ঢাকার আদিবাসী, যাদের আমরা ঢাকাইয়া বলে জানি, তাদের আত্মসম্মানবোধ স্বাভাবিকের তুলনায় একটু বেশিই। ক্রেতা আকর্ষণে সম্ভবত, এই আত্মমর্যাদায় আঘাত দিয়ে ব্যবসাটি চাঙ্গা করার অভিপ্রায়েই পাঁচমিশালি এই ইফতারি আইটেমটির নামকরণ করা হয়েছে। ঢাকাইয়া হওয়ার সুবাদে অনেক কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি, ঢাকাইয়ারা একজন আরেকজনের কাছে কোনো অবস্থায়ই মাথা নোয়ান না। হোক সেটা বিয়ের খাওয়া, কিংবা ঈদের কেনাকাটা অথবা কোরবানির গরু। এ জন্যই চকবাজারের ইফতারির মার্কেটে যখন বিশাল হাঁকে ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ শব্দটি উচ্চারিত হয় তখন পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া

এক ঢাকাইয়া, আরেকজনকে সেটা কিনতে দেখে শুধু ওই আত্মমর্যাদা রক্ষায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিনতে বাধ্য হন। মাঝখান থেকে লাভ হয় ওই ব্যবসায়ীর যিনি নিজেও একজন ঢাকাইয়া। বর্তমানে চকবাজারের কয়েক জায়গায় এ আইটেমটি পাওয়া যায়।

ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে দেখা যায়, যার হাত দিয়ে এই আইটেমটির উৎপত্তি তিনি হলেন পুরান ঢাকার বাসিন্দা দাতা মোহাম্মদ কামাল মাহমুদ, যিনি কামেল মিয়া নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি বরাবরই ছিলেন একজন ভোজনরসিক মানুষ। নানা ধরনের মুখেরোচক খাবার তৈরি করতে জানতেন তিনি। এই খাবারটিও তারই সৃষ্টি। প্রায় ৮০ বছর আগে তিনিই প্রথম এই মুখরোচক খাবারটি তৈরি করে এখানে বিক্রি শুরু করেন। বটপাতার ডালায় করে তিনি বিক্রি করতেন ‘বড় বাপের পোলায় খায়’। সেই থেকে আজও পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে এটি বেশ জনপ্রিয়। এ জনপ্রিয়তা পুরান ঢাকার সীমানা পেরিয়ে বিস্তৃত হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। এমনকি শুধুমাত্র এই আইটেমটির জন্য রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা ছুটে যান চকবাজারে। এখানে পুরান ঢাকার এমন অনেক পরিবার আছে, যাদের এই খাবারটি ছাড়া ইফতার পূর্ণতা পায় না। নতুন ঢাকার বাসিন্দারাও দিন দিন এই খাবারটির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

তিন পুরুষ পেরিয়ে মোহাম্মদ কামালের বংশধররা এখনো হাল ধরে রেখেছেন এই ঐতিহ্যবাহী খাবারটির। তার মৃত্যুর পর ছেলে জানে আলম মিয়া বড় বাপের পোলায় খায় নামক এই খাবারটি বিক্রি করতেন। ইতোমধ্যে তিনিও গত হয়েছেন। ২৫ বছর ধরে তার বংশধররা এই মুখরোচক আইটেমটি বিক্রি করছেন। এই পাঁচমিশালি ইফতার আইটেমটি সম্বন্ধে পুরান ঢাকার লোকজন অনেক আগে থেকেই জ্ঞাত। কিন্তু বাইরের মানুষ এ সম্বন্ধে জেনেছেন অনেক পরে। বিশেষ করে সাম্প্রতিককালে মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে এই ইফতার আইটেমটি সম্পর্কে বেশি জানতে পেরেছেন। এর আগে তারা শুধু জানতেন এই নামে একটি ইফতার আইটেম আছে। প্রকৃতপক্ষে অন্যান্য ইফতারি আইটেমের তুলনায় এটি সম্পূর্ণ আলাদা এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ। যা পাওয়া যায় শুধু চকবাজারে। এখন বিচ্ছিন্নভাবে আরও দু’একটি জায়গায় পাওয়া গেলেও গুণে-মানে সে রকম নয়। কারণ আদি উদ্ভাবকের রহস্যময় মিশ্রণের ফর্মুলাটি সেই পরিবারের মধ্যেই শুধু রয়ে গেছে বিধায়, সেটা আদৌ ‘বড় বাপের পোলায়’ না খেলেও এ নামে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

 

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>