ভ্যাটের ওপর নির্ভরশীলতা বড় চ্যালেঞ্জ

জুন ০১ ২০১৭, ২১:০৯

জাতীয় সংসদে আজ বৃহস্পতিবার ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বাজেট প্রস্তাবের পর প্রথম আলোর পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদেরা বলেছেন, ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে প্রস্তাবিত বাজেটে ভ্যাট আইনে অনেক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, যেটা ঠিক হয়নি। তাঁরা বলছেন, ১৫ শতাংশ কর হার নিয়ে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বিতর্ক ওঠা অযৌক্তিক। তবে সরকারের আগে থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়গুলো জানানো উচিত ছিল। এ ছাড়া রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ভ্যাটের ওপর নির্ভরশীলতা এই বাজেটের বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাজেটে করপোরেট কর হার কমানো হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে শিক্ষা ও প্রযুক্তি এবং অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ, এই বিষয়গুলোকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর  বলেন, মূসক নিবন্ধন সীমা ৮০ লাখ থেকে বাড়িয়ে দেড় কোটিতে উন্নীত করা হয়েছে। এটা ঠিক হয়নি। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এই সীমা অনেক কম। ভ্যাটের হার নিয়ে ব্যবসায়ীদের বিতর্ক পুরোপুরি অযৌক্তিক বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মত, এটা বিজনেস কমিউনিটির এখতিয়ারবহির্ভূত।
বাজেটে ব্যাংক হিসাবে কমপক্ষে ১ লাখ টাকা থাকলে আবগারি শুল্ক বাড়ানো হয়েছে, যা একদম নীতিবহির্ভূত বলেই মনে করেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, আমরা আর্থিক খাতের বিস্তৃতি বাড়াতে চাচ্ছি। এই সিদ্ধান্ত সেই লক্ষ্যের পরিপন্থী হচ্ছে। টেলিযোগাযোগের ডেটা ব্যবহারের ওপরও কর বাড়ানো হয়েছে। এটা এই শিল্পের জন্য ক্ষতিকর। ব্যবসা-সহায়ক ইনপুটে আমরা কেন কর আরোপ করব? এগুলো ব্যবসাবান্ধব সিদ্ধান্ত নয়।
বাজেটের বেশ কিছু বিষয়কে সাধুবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো নাজনীন আহমেদ বলেন, করপোরেট কর হার কমানো, কম্পিউটারসহ মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এমন অনেক খাতে শুল্ক কমানো হয়েছে। যা খুবই ইতিবাচক। এ ছাড়া এই বাজেটকে বাণিজ্যবান্ধব বাজেট বলা যেতে পারে। অবকাঠামো খাতে উন্নয়নের জন্য যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন হলে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে।


তবে বাজেটের ভ্যাট আইনের কিছু সমালোচনা করে নাজনীন আহমেদ বলেন, ভ্যাট আইনকে নিয়ে বাজেটের আগে যেভাবে বলা হয়েছিল, সে রকমটা দেখা যায়নি, অনেক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এটা শুরুতেই বলা উচিত ছিল। এখন মনে হচ্ছে, ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে চাপে পড়ে ভ্যাট আইনে

এই অব্যাহতি রাখা হয়েছে। বাজেট তো হওয়া উচিত দেশের প্রয়োজনে। চাপের মুখে পরিবর্তন হলো, এটা ঠিক নয়। এটা সঠিক পদক্ষেপ নয়। পরবর্তী সময়ে অন্য ক্ষেত্রে এ ধারা প্রচলিত হতে পারে।
শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে একসঙ্গে বরাদ্দ রাখা ও সোলার প্যানেলের শুল্ক বাড়ানো উচিত হয়নি বলে মনে করেন নাজনীন আহমেদ। এ ছাড়া করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো উচিত ছিল বলেও মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশ ধরে করমুক্ত আয়ের সীমা কিছুটা হলেও বাড়ানো উচিত ছিল।
প্রস্তাবিত বাজেটের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে এগিয়ে গেলে বাংলাদেশে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে—এমন আশা প্রকাশ করে বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহীম বলেন, করপোরেট কর হার কমানোর উদ্যোগ অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে করপোরেট কর হার বেশি ছিল। এখন এটি একটি সমতায় এল। ভ্যাট নিয়ে এত আলোচনার পর এর অনেক অব্যাহতি ও শিক্ষা এবং প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি অবশ্যই প্রশংসনীয়।
তবে অবকাঠামো খাতে যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে তার সঠিক প্রয়োগ জরুরি। এর জন্য সঠিক পর্যবেক্ষণ বা তদারকির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন আসিফ ইব্রাহীম। তিনি বলেন, আমাদের প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্য সেই অনুযায়ী এগোতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে যেসব সমস্যা তা মোকাবিলা করতে হবে।
বাজেট নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানান এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ। তিনি বলেন, বিশাল আকারের বাজেট। ঠিক আছে। তবে সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ। অনেকগুলো ‘যদি’ ও ‘কিন্তু’র ওপর নির্ভর করছে। তাই বাস্তবায়ন না হলে চাপের মুখে পড়বে অর্থনীতি।
কিছুটা খোলাসা করে আবদুল মজিদ বলেন, অর্থায়ন করতে এনবিআরের ওপর চাপ বেশি পড়বে। এনবিআর-বহির্ভূত আয়ে গত বছরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি একদমই নেই। অর্থাৎ সরকারের নিজের কোম্পানিতে দক্ষতা কম এটাই দেখা যাচ্ছে। সরকারি ব্যাংক থেকে কোনো আয়ই হয় না। ফলে জনগণের ওপর চাপ পড়ছে। আয়করের চেয়ে ভ্যাটের ওপর সরকার নির্ভর করছে বেশি। ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায় কতটা বাস্তবায়িত হবে তা নির্ভর করছে এনবিআর ও ভ্যাট প্রদানকারীর দক্ষতার ওপর। সূক্ষ্ম হিসাব দরকার, ধরে নিতে হবে সবাই অনলাইনে ভ্যাট পরিশোধ করবে, এই সবকিছু ধরে নিয়ে এই লক্ষ্য পূরণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। যা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>