ভ্যাটের প্রভাবে বাড়তে পারে বহু পণ্যের দাম

জুন ০৩ ২০১৭, ১৫:৩০

গৃহস্থালিতে ব্যবহার হওয়া থালা-বাটি, জগ-মগ, বালতিসহ ১৯ ধরনের প্লাস্টিক পণ্য ভ্যাটের আওতার বাইরে ছিল। জুলাই থেকে এসব পণ্যের উপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। প্লাস্টিক পণ্যের পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়াও ভ্যাট অব্যাহতির তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্ততকারক সমিতির সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, বাড়তি ভ্যাট দিতে হলে পণ্যের দাম বাড়াতে হবে।
দেশে বিক্রিত গার্মেন্টস পণ্যের (যে কোনো ব্র্যান্ডের নামে) উপর এতদিন চার শতাংশ হারে ভ্যাট ছিল। জুলাই থেকে তা ১৫ শতাংশ হচ্ছে। সঙ্কুচিত ভিত্তিমূল্যে দেড় থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে ভ্যাট দিত ১৫ ধরনের পণ্য ও সেবা। এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিলের ভ্যাট ছিল ৫ শতাংশ। এসব পণ্যের ভ্যাট বেড়ে ১৫ শতাংশ হচ্ছে। এমএস রডসহ ৭০ ধরনের পণ্য ও সেবায় ট্যারিফ ভিত্তিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা ভ্যাট দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। ট্যারিফ ব্যবস্থা বাতিল হয়ে এখন তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরাসরি ১৫ শতাংশ ভ্যাট হচ্ছে।
এতদিন প্রতিটন রডের জন্য ৮শ টাকা ভ্যাট ছিল। ওই ভ্যাট বেড়ে এখন সাত হাজার টাকা হবে। যদিও শুল্ক সুবিধা দেওয়ায় রডের প্রকৃত ভ্যাট কিছুটা কমবে, কিন্তু তা নিশ্চয়ই ৮শ টাকায় নামছে না। জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট কার্যকর হওয়ার পর এ ধরনের অনেক পণ্য ও সেবায় বাড়তি ভ্যাট পরিশোধের কারণে দর বাড়তে পারে। রডের দর বাড়লে তার প্রভাব পড়বে বাড়ি নির্মাণসহ সব ধরনের অবকাঠামোর ব্যয়ে। চাপ আসবে ভোক্তার উপর।
অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, নতুন ভ্যাট কার্যকর হওয়ার পর মূল্যস্ফীতি হবে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম  বলেন, ১৫ শতাংশ ভ্যাটের কারণে মূল্যস্ফীতি কিছুটা হবেই। আমাদের দেশে দেখা যায়, ১০টি পণ্যের দাম বাড়লে তার দেখাদেখি অব্যাহতি থাকা সত্ত্বেও বাকি পাঁচটি পণ্যের দাম বাড়ে।
তবে এর মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিত্সা সেবার মতো বিষয়কে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ১ হাজার ৪৩ ধরনের পণ্য ও সেবা অব্যাহতির তালিকায় রয়েছে, যার অল্প কিছু বাদে বেশিরভাগই সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে পড়ে না।
রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ১৫ শতাংশ ভ্যাট হলেও পণ্য উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে সংযোজিত মূল্যের উপরই ভ্যাট হবে। সেক্ষেত্রে পূর্বে পরিশোধ করা ভ্যাট রেয়াত নেওয়ার সুযোগ
রয়েছে। কিন্তু এ জন্য হিসাব রাখতে হবে। এনবিআরের নির্ধারিত চালানপত্র সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় চালানপত্রসহ এ ধরনের হিসাব রাখার সুযোগ বা সামর্থ্য সবার নেই। ফলে তারা রেয়াত নিতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে বাড়তি ভ্যাট দিতে হবে।
একজন ব্যবসায়ী উদাহরণ দিয়ে বলেন, মিষ্টি তৈরির উপকরণ দুধ গ্রামের গোয়ালের কাছ থেকে সংগ্রহ করতে হয়। ওই লেনদেনে হিসাবপত্র কিংবা ভ্যাট চালান কি আদৌ সম্ভব? ফলস্বরূপ মিষ্টি বিক্রেতা রেয়াত নিতে ব্যর্থ হলে বাড়তি ভ্যাট দিতে হবে। এই চাপ যাবে ভোক্তার উপরে।
প্লাস্টিক খাতের উদাহরণ দিয়ে জসীম উদ্দিন বলেন, প্লাস্টিকসহ অনেক পণ্যের কাঁচামাল প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। তারা চালানপত্র দেবে না। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, এটি চিন্তা করেই আমরা প্রস্তাব দিয়েছিলাম একাধিক হারে ভ্যাট আরোপের। অর্থাৎ যারা রেয়াত নিতে পারবে না, তারা সঙ্কুচিত ভিত্তিমূল্যে ভ্যাট দেবে। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই এ ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিল ও দেশীয় বাজারে বিক্রি হওয়া তৈরি পোশাক পণ্য ছাড়াও সঙ্কুচিত ভিত্তিমূল্যে আসবাবপত্র, স্বর্ণ ও রৌপ্যকার, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, মটর গাড়ির গ্যারেজ, কনস্ট্রাকশন ফার্ম, ডকইয়ার্ড, ভূমি উন্নয়ন ফার্ম, আসবাবপত্র উত্পাদন ও বিক্রয়, পরিবহন কন্ট্রাক্টর, নিলামের পণ্য ক্রেতা, স্পন্সরশীপ সেবা, ভবন নির্মাণকারী ফার্মসহ আরো কিছু খাত ভ্যাট দিত।
রড ও রড তৈরির কাঁচামাল ছাড়াও হাতে তৈরি বিস্কুট, কেক, রুটি, আচার, চাটনি, টমেটো সস, তামাকজাত পণ্য, নিউজপ্রিন্ট ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের কাগজ, ডুপ্লেক্স বোর্ড ও পেপার, টয়লেট ও নেপকিন টিস্যু, ফেসিয়াল টিস্যু, কৃত্রিম আঁশ, তারকাঁটা, বৈদ্যুতিক বাতিসহ ৭০ ধরনের পণ্য ও সেবায় ট্যারিফ মূল্যভিত্তিতে ভ্যাট ছিল। এর বেশিরভাগ পণ্য ও সেবায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট বসছে। ফলে ভোক্তা পর্যায়ে ব্যয় বাড়তে পারে।
এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হলেও কিছু ক্ষেত্রে সমন্বয় (অব্যাহতি) করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি হবে। রডের ভ্যাট বাড়ার ফলে সব ধরনের নির্মাণ কাজের ব্যয় বাড়বে। এমনিতেই হাউজিং শিল্প সংকটে। এটি সংকট আরো বাড়াবে। যারা রেয়াত নিতে সমর্থ্য নয়, তাদের তো ভ্যাটই হওয়া উচিত নয়। এসব বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করব। আস্থাহীনতা দূর করতে হবে।
Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>