মেঘনা নদীর বুকে চলবে গাড়ি!

এপ্রিল ১৮ ২০১৭, ১৩:৩৯

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ২১ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রায় ৩০টি নদ-নদী পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। পলি পড়ে ও চর জেগে নাব্যতা হারিয়েছে অধিকাংশ নদী। এখন সামান্য জোয়ার হলেই নদীর দু-কূল উপচে পানি ঢুকে পড়ে গ্রাম ও চরগুলোতে। সামান্য জোয়ারেই দেখা দেয় প্লাবন। নষ্ট হয় ফসলি জমি।

নদীতে সামান্য পানি থাকলেও তা লবণাক্ত। নদীর এ বেহাল দশায় হুমকির মুখে পড়েছে নৌপথ। চাষাবাদও আর আগের মত করতে পারছেন না কৃষকরা। লোকসান পুষিয়ে নিতে স্রোতস্বীনি নদ-নদীর মরদেহে ইরি-বোরোর আবাদ শুরু করেছেন।

অথচ এক সময় এসব নদ-নদী ছিল উত্তাল। নদীগুলোর বুক চিরে চলাচল করতো বড় বড় লঞ্চ, স্টিমার ও জাহাজ। ভারত, পাকিস্তান, ইয়াংগুনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও পণ্য আনা-নেয়ার জন্য এ নদীগুলোই ছিল একমাত্র ভরসা।

এখন ‘মেঘনার বুকে চলবে গাড়ি, সেই দিন বেশি দূরে নয়’ গানের কথা সত্যি হতে চলেছে। প্রমত্তা মেঘনার বিভিন্ন স্থানে জেগে উঠেছে চর। কোথাও ইরি-বোরো আবাদ হচ্ছে আবার কোথাও গড়ে উঠেছে মানুষের আবাসভূমি। আগে ভোলা ও লক্ষ্মীপুরের মধ্যবর্তী প্রমত্তা মেঘনার এপার – ওপার দেখা যেত না। এখন মাঝখানে জেগে উঠেছে একাধিক বিশাল চর।

ভোলা সদর উপজেলার মধ্যে জেগে উঠা চরটির নাম দেয়া হয়েছে মাঝের চর। সেখানে এখন হাজারো পরিবারের বসতি। তার পার্শ্ববর্তী চরটি নিয়ে তৈরি হয়েছে দৌলতখান উপজেলার মদনপুর ইউনিয়ন। গত কয়েক বছরে জেগে উঠা এসব চরে স্কুল, মাদ্রাসা, রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট সবকিছুই নির্মাণ করা হয়েছে। দেখে বোঝার উপায় নেই একযুগ আগেও এসব স্থান দিয়ে বড় বড় জাহাজ চলাচল করত। এক সময়ের শাহবাজপুরের এই চ্যানেল এখন মরা নদীতে রূপ নিয়েছে।

একইভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে মেহেন্দিগঞ্জের চর নাইন্দা চ্যানেল। ঐ উপজেলার উলানিয়ার দূরবর্তী মেঘনায় জেগে উঠেছে চর। অসংখ্য চরের জন্ম হয়েছে হিজলা, চাঁদপুর, ভোলাসহ ঢাকা-বরিশাল রুটের বিভিন্ন স্থানে। অভ্যন্তরীণ রুটগুলোর মধ্যে নাব্যতা সংকটে ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ২৮টি নৌ- রুট। বরিশাল-ভোলা নৌ পথের সাহেবেরহাট ও লাহারহাটে নাব্যতা সংকটে নৌ চলাচল বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

আড়িয়াল খাঁ নদীতে ইতিপূর্বে বহুবার ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে লঞ্চডুবি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সেই নদীতে একাধিক চর জেগে উঠেছে। চরের কারণে ফেরি পারাপারে সময় লাগে দু’ঘন্টা। কালাবদরের বিভিন্ন স্থানে জেগে উঠা চরগুলোতে ব্যাপক হারে চাষাবাদ হচ্ছে। চরফ্যাশনের বুড়া গৌরগঙ্গা নদী, পাথরঘাটার

বিষখালী, গলাচিপার আগুনমুখা নদীর সেই রূদ্ররোষ আর নেই। এসব নদীতে পানি সংকট চলছে।

খোদ বরিশাল নগরী সংলগ্ন কীর্তনখোলা নদীতেই জেগে উঠেছে একাধিক চর। নগর ঘেঁষে জেগে উঠা এসব চরের নাম রসুলপুর, মোহাম্মদপুর ও পলাশপুর। প্রায় দুই যুগ আগে নদীর বুকের জন্ম নেয়া এ চরগুলোতে আধুনিক শহরের ছোঁয়া লেগেছে। লঞ্চঘাট সংলগ্ন এলাকায় পলি জমাট বেঁধে নাব্যতা হারিয়েছে কীর্তনখোলা।

পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামপ্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩০টি নদীর পানি প্রবাহের প্রধান উত্স পদ্মা ও মেঘনায় প্রবাহ কমে যাওয়ায় এসব শাখা নদীতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। উজানের নদীগুলোতে তীব্র পানি সংকট দেখা দেয়ায় ভাটি অঞ্চল তথা দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীগুলোর এ বেহাল দশা হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ’র মতে, এ অঞ্চলের ১৪শ’ কিলোমিটার নৌপথ বিপন্ন হয়েছে। ড্রেজিংয়ের অভাবে দেশের প্রয়োজনীয় নদীগুলোর চর অপসারণ করা সম্ভব না হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডরকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ দিলেও নদী রক্ষায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই। ফলে একদিকে ভাঙ্গন প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না অপরদিকে নদীও রক্ষা করা যাচ্ছে না। নদী মাতৃক বরিশাল অঞ্চলের সঙ্গে মংলা বন্দরে ব্যবসা বাণিজ্যের এক সময়ে যে যৌবন ছিল তাতে ভাটা পড়েছে। গাবখান চ্যানেল ড্রেজিং করেও সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

নদীর এই বেহাল দশায় অসংখ্য নদীনালা বেষ্টিত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বাণিজ্যকেন্দ্রগুলো ঐতিহ্য হারাচ্ছে। নাব্যতা সংকটের কারণে শিল্পনগরী খুলনা এখন রুগ্নশিল্প নগরীতে পরিণত হয়েছে। সড়কপথ ব্যবহারে উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় উত্পাদিত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিজনিত সমস্যায় দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের শিল্প কারখানাগুলো একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। শ্রমিকরা হয়ে পড়ছে বেকার।

কৃষি উত্পাদন বাড়াতে নদীর ওপর ভিত্তি করে এ অঞ্চলে নির্মিত গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্প (জিকে প্রজেক্ট), সঞ্জুরি প্রজেক্ট, মধুমতি-মাদারীপুর বিল রুট ক্যানেল সেচ প্রকল্প (এমবিআর প্রজেক্ট), বরিশালের উজিরপুরের সাতলা-বাগদা সেচ প্রকল্প, বরিশাল-ঝালকাঠী ও পিরোজপুরের ইরিগেশন প্রকল্পসহ অসংখ্য সেচ প্রকল্পের কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। বছরের পর বছর প্রকল্পভুক্ত বিস্তীর্ণ ফসলি জমি অনাবাদী থাকায় উত্পাদন কমে গেছে।

পলি জমে নদ-নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ায় এ অঞ্চলে মত্স্য সম্পদও উজাড় হতে চলেছে। মিঠা পানির কমপক্ষে ৫০ প্রজাতির মাছ হারিয়ে গেছে। ফলে জেলে সমপ্রদায়ের লাখ লাখ মানুষ পেশা হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছে। কৃষি, মত্স্য, শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্য ক্ষেত্রে ক্রমাবনতির কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ধস নেমেছে। -ইত্তেফাক

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>