মোশাররফ করিম নামের রহস্য

আপডেট : July, 2, 2017, 1:30 am

ছেলে কর্তৃক বাবার স্বপ্ন পূরণ নাট্যাংশের ছিটেফোঁটাও দেখে যেতে পারেননি বাবা কেএম আব্দুল করিম। তার বাবা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেছেন বছর বিশেক পূর্বে। তবে ছেলে কিন্তু তার বাবাকে ভোলেননি। মোশাররফ করিম নামটা আসলে বাবার প্রতি এক সন্তানের ভালোবাসার নিদর্শন। নিজের আসল নামের (মোশাররফ হোসেন) শেষের হোসেন বাদ দিয়ে বাবার করিম যোগ করে নিয়েছেন মোশাররফ। অভিনেতা হিসেবে নিজের নামের সাথে তার বাবার নামটাও মানুষ বলবে, শুধু এটাই তার চাওয়া ছিলো।
বেশ কিছুদিন পূর্বে একান্ত আলাপনে বিষন্ন মনে নিজ নামের মুল রহস্যের জট খুলে দিয়েছেন দেশবরেন্য নাট্যাভিনেতা মোশাররফ করিম। যদিও তার সেই আশা আজ দেশের মাটি ছাঁপিয়ে বিশ্বব্যাপী সর্মাধিত। সর্বস্তুরের মানুষের জনপ্রিয় এ অভিনেতা আরও বলেন, “বাবা আমাকে অভিনেতা বানাতে চেয়েছিলেন কিন্তু সেটি কোনোদিন বলার সাহস পাননি। আজ সামনে পেলে বাবার পা ছুঁয়ে বলতাম, বাবা তোমার জয় হয়েছে।”
মোশাররফ করিমের সংক্ষিপ্ত ইতিকথা ॥ আড়িয়াল খাঁ নদীর পাড়ের বরিশালের গৌরনদী উপজেলার নলচিড়া ইউনিয়নের পিঙ্গলাকাঠী গ্রাম। ওই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল করিম স্বপ্ন দেখেছিলেন নিজেই দেশবিখ্যাত অভিনেতা হওয়ায়। কপালের ফের আব্দুল করিমের সেই স্বপ্ন সত্যি হয়নি। সে সময় যাত্রাপালার দিকে ঝোঁক ছিল আব্দুল করিমের। নিজের এলাকায় তার খানিকটা নামডাকও সবে ছড়াতে শুরু করেছিল কিন্তু নামডাক দিয়েতো আর পেট ভরেনা। ততোদিনে সংসার বড় হতে শুরু করেছে। এসব ভাবনাচিন্তা অচিরেই কাবু করে ফেলে আব্দুল করিমকে। অভিনয়-অন্তপ্রাণ এই মানুষটা একদিন সত্যি সত্যিই তার প্রিয় জগৎ থেকে পুরোপুরি ইস্তফা দিতে বাধ্য হলেন। মন দিলেন ব্যবসায়। পিঙ্গলাকাঠী গ্রামের আব্দুল করিমের অভিনেতা বনে যাওয়ার স্বপ্ন এভাবেই মাঠে মারা যায়। সংসার ভেসে যাওয়ার ভয়ে আব্দুল করিম অভিনয় ছেড়ে ঢাকার বাসিন্দা হয়েছিলেন। কিন্তু ওই যে অভিনয়ের দিকে তার অন্তরের টান সেটা ফিকে হয়নি কখনও। যার প্রমাণ ১৯৭০ সালের ২২ আগস্ট ঢাকায় বসে জন্মগ্রহন করা তার সন্তান মোশাররফ হোসেন (গ্রামের ডাক নাম শামীম)।
একদম ছোট্ট বেলা থেকেই দুষ্টমিতে মাতোয়ারা মোশাররফ ভুল করেও কোনোদিন বইখাতার নাম মুখে আনেননি। একপর্যায়ে ছেলেকে কোনোমতেই কায়দা করতে না পেরে শেষে মোশাররফ হোসেনকে পিঙ্গলাকাঠীর গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। গ্রামে গিয়ে ভালো রকমের বেকায়দায় পরে যায় মোশাররফ। অনেকটা জোরজবরদস্তি করেই মোশাররফকে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয় পিঙ্গলাকাঠীর চিপারটাইপ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মোশাররফ মুখ বুজে সব সয়ে গেল। কারণ গ্রামে অভিভাবক বলতে ছিলেন তার মেজো ভাই। যাকে সে যমের মতো ভয় করে। মেজো ভাইয়ের ভয়েই কি না কে জানে, একসময়ে সত্যি সত্যিই স্কুলের “গুড বয়” হয়ে উঠতে লাগল এককালের “স্কুল পলাতক” ছেলে মোশাররফ। যে অঙ্কের কথা শুনলে তার ঘাম দিয়ে জ্বর আসতো, সেই অঙ্কেই সে পেল ৯৮। যে গ্রামে এসে পেরেশানির শেষ ছিলনা, সেই গ্রামই একসময় প্রিয় হয়ে উঠতে লাগল মোশাররফের কাছে। অন্যদের অঙ্গভঙ্গি, গলার স্বর নকল করার অভ্যাসটা তার ছিল শুরু থেকেই। বাবার প্রশিক্ষণের কল্যাণে আবৃত্তি করতেন চমৎকার। হাইস্কুলে ওঠার পর এসব আপাত ছোটখাটো গুণই আলাদা করে তুলতে শুরু করে মোশাররফকে। স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মানেই মোশাররফ আর মোশাররফ। আবৃত্তিতে প্রথম পুরস্কারতো অভিনয়ে জোরদার হাততালি। একই সাথে চলছিল যাত্রাপালায় শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়।
মা আর বড় ভাইয়েরা মোশাররফের অভিনয় প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হওয়ার চেয়ে শঙ্কিতই হয়ে উঠছিলেন বেশি। কিন্তু মাথার ওপরে বটবৃক্ষ হয়ে ছিলেন বাবা আব্দুল করিম। তিনি আলবৎ জানতেন, যাত্রার দিকে ঝোঁক মানেই অনিশ্চিত ভবিষ্যত। নিন্দুকদের ভাষায়, ¯্রফে গোল্লায় যাওয়া। তাই প্রকাশ্যে বাবা আব্দুল করিম ছেলেকে উৎসাহ দেওয়ার সাহস পেতেন না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে মনেপ্রাণে চাইতেন, ছেলে

যেন অভিনয়টা চালিয়ে যায়। ছেলেকে উৎসাহ দিতেই তিনি ঢাকায় এনে তাকে রীতিমতো টিকিট কেটে নিয়ে যেতেন মঞ্চনাটক দেখাতে। আব্দুল করিমের সেদিনের গোপন বাসনা অপূর্ণ থাকেনি। নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের সম্ভাবনা তিনি দেখেছিলেন ছেলে মোশাররফের মধ্যে। মোশাররফ বাবাকে বিমুখ করেননি। মোশাররফ করিম এখন আমাদের দেশের উজ্জ্বলতম এক তরুণ অভিনয় প্রতিভার নাম। ১৯৮৬ সালে মোশাররফ করিমের অভিনয়ের প্রতি ভালবাসার অন্য মাত্রা নেয়ার পর তিনি নাট্যকেন্দ্রে যোগদান করেন। এখনও তিনি এই নাট্যদলের সদস্য।
দাম্পত্য জীবন ॥ মোশাররফ করিম এলাকার কোচিং সেন্টারের শিক্ষক, জুঁই তার ছাত্রী। সেখান থেকেই ভাললাগা, তারপর ভালবাসা, বিয়ে, সংসার, সন্তান ইত্যাদি। অত্যন্ত হাস্যোজ্জল, সাদামাটা জীবন-যাপনে অভ্যস্ত রোবেনা রেজা জুঁই তার স্বামী মোশাররফ করিমের পাশাপাশি নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। মোশাররফ করিমের সাথে জুঁইয়ের প্রথম পরিচয় হয় ২০০০ সালে। সে সময় মোশাররফ করিম জুঁইদের বাসার সামনের গলির একটি কোচিং সেন্টারের শিক্ষক ছিলেন। এখনকার মোশাররফ করিম সে সময় শামীম নামেই পরিচিত ছিলো। সেই কোচিং সেন্টারের ছাত্রী ছিলেন জুঁই। সেখান থেকেই দু’জনের পরিচয়, প্রেম ও নানা চড়াই-উৎরাইয়ের পর ২০০৪ সালে সামাজিকভাবে বিয়ের বন্ধনে তারা আবদ্ধ হন। বিয়ের পর জীবনের গতি পরিবর্তন করেন মোশাররফ করিম। শিক্ষকতা ছেড়ে অভিনয়ের দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে পরেন। বিয়ের পর প্রায় দেড় বছর অভাব-অনটনের মধ্যে দিয়েই গিয়েছে তাদের দিনগুলো। একসময় তাদের সংসারে সুখের বাতাস বইতে শুরু করে। দু’জন মিলে সুন্দর করে সাজিয়ে তোলে তাদের ছোট্ট সংসার। জুঁই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃ-বিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করার পর তার কোল জুড়ে আসে তাদের একমাত্র পুত্র সন্তান রোবেন রায়ান করিম। বনশ্রীতে নিজেদের একটি সন্তান, শ্বাশুড়ি, ভাইয়ের দুটি মেয়ে, বোনের ছেলে, দেবর আর তার স্ত্রীকে নিয়ে মোশাররফ-জুঁই দম্পতির বসবাস।
ঈদে বাড়িতে না আশায় ভক্তরা হতাশ ॥ প্রতিবছরের ন্যায় এবারের ঈদ-উল-ফিতরের সময় মোশারফ করিম গ্রামের বাড়িতে না আশায় তার ভক্ত ও বন্ধুরা হতাশ হয়েছেন। মোশারফ করিমের বংশীয় চাচাতো ভাই আনোয়ার হোসেন বাদল জানান, প্রতি বছর ঈদের সময় শামীম ভাই (মোশাররফ করিম) বাড়িতে এসে ২/১দিন থাকেন। সেই স্বল্প সময়ে জমিয়ে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিয়ে আনন্দ ফূর্তি করে সময় কাটান। গ্রাম ঘুরে এ বাড়ি থেকে ও বাড়িতে ছুটে সবার খোঁজ খবর নেন। পুরো গ্রামটি মাতিয়ে রাখেন। তিনি আরও জানান, শামীম ভাইয়ের সবচেয়ে পছন্দ হচ্ছে বাড়ির সামনের আড়িয়াল খাঁ নদীর শাখা পালরদী নদীর তীরে আড্ডা দেওয়া ও নদীতে গোসল করা। প্রতিবেশীরা জানান, শামীম বাড়িতে আসলে যে কয়দিন থাকেন প্রতিদিন শত শত ভক্তরা বাড়িতে ভীড় জমায়। শামীম সকলের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন। সকলকে সে বুকে টেনে নিয়ে কুশল বিনিময় করেন।
এলাকাবাসীরা জানান, মোশাররফ করিম আজ দেশের গর্ব। সে বাড়িতে আসলে শত শত ভক্তরা তার বাড়িতে ভীড় জমায়। অথচ তার (মোশাররফ করিম) বাড়িতে যাতায়াতের জন্য কোন রাস্তা বা পথ নেই। অন্যের বাড়ির ওপর দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। তাই তারা মোশাররফ করিমের বাড়িতে যাতায়াতের জন্য একটি রাস্তা নির্মাণ করে দেয়ার জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে দাবি জানিয়েছেন। মোশারফ করিমের গ্রামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু নজরুল হাওলাদার ও হাবিবুর রহমান জানান, এবারের ঈদে মোশাররফ করিম স্ব-পরিবারে মালেশিয়ায় থাকায় দেশে আসতে পারেনি। তাই তাদের ঈদও তেমন একটা ভাল কাটেনি। গৌরনদী সদরের নিজবাড়িতে বসবাস করছেন মোশাররফ করিমের বড় বোন হেলেনুর রহমান। তিনি জানান, তারা পাঁচ ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে শামীম খলিফা (মোশারফ করিম) হচ্ছে চতুর্থ। ঈদ-উল-ফিতরের সময় গ্রামের বাড়িতে আসতে না পারায় মোশাররফ করিম দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

 

Facebook Comments