যাবজ্জীবন ৩০ বছর নাকি আমৃত্যু?

আপডেট : May, 21, 2017, 10:35 am

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কি ৩০ বছরের কারাদণ্ড নাকি আমৃত্যু কারাদণ্ড এ প্রশ্নের মীমাংসা চান আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, দেড়শ’ বছর ধরে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ৩০ বছর হিসেবে ধরা হতো। আর ভালো আচরণ এবং জেলখানার বছর গণনার রীতি অনুযায়ী এ দণ্ডের মেয়াদ নির্ধারিত হতো। এখন সর্বোচ্চ আদালতের একটি রায়ের ফলে প্রতিষ্ঠিত একটি বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।

গতকাল শনিবার রাজধানীতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল’ অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (বিলিয়া) মিলনায়তনে ‘ইমপ্রিজনমেন্ট ফর লাইফ অ্যাজ ইমপ্রিজনমেন্ট টিল ডেথ: রিফ্লেকশনস অন জুরিস প্রুডেনশিয়াল ইস্যুজ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির বেঞ্চ একটি হত্যা মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামির দণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন দণ্ড দেন। একই সঙ্গে এই যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাবাস বলে অভিমত দেওয়া হয়।

ওই রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম গণমাধ্যমকে বলেন, প্রচলিত দণ্ডবিধি অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে ৩০ বছরের দণ্ড। যাদের যাবজ্জীবন দণ্ড হবে তাদের ৩০ বছরই কারাগারে থাকতে হবে। কিন্তু যাদের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন দেওয়া হবে তাদেরকে আমৃত্যু কারাগারে থাকতে হবে। আমি মনে করি, আপিল বিভাগ সেটিই বোঝাতে চেয়েছে। এটর্নি জেনারেলের এ অভিমতের পরও এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।

বিলিয়ায় অনুষ্ঠিত সভার সভাপতি সাবেক আইন সচিব কাজী হাবিবুল আওয়াল বলেন, সারাবিশ্ব ও বাংলাদেশে যাবজ্জীবন ধারণাটি স্পষ্ট। হঠাত্ বিষয়টি নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি করা হলো। কারা কর্তৃপক্ষ ও অ্যাটর্নি জেনারেলও তো

কখনো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নিয়ে দ্বিধায় ভোগেনি। তাহলে এখন কেন এই বিভ্রান্তি?

হাবিবুল আওয়াল বলেন, ‘যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত যেসব আসামি কারাগারে থাকা অবস্থায় রেমিসন (সাজা হ্রাস) পান, তাদের কী হবে? এ ক্ষেত্রে ৩০ বছর হিসাবটি সঠিক। কারণ, কেউ যখন ভালো কাজ করেন, সে অনুসারে তার সাজা মাফ করে জেল কর্তৃপক্ষ। ’ তিনি বলেন, আমৃত্যু কারাদণ্ড হলে এই মানুষ যখন বার্ধক্যে পৌঁছবেন, তখন তাদের দেখভাল করার লোক থেকে শুরু করে আরো অনেক ধরনের সমস্যা তৈরি হবে। সেসব সমাধান করবে কে?

বিলিয়ার পরিচালক ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, আমি মনে করি অস্পষ্টতা দূর করার জন্য সর্বোচ্চ আদালতের এ সংক্রান্ত রায়টি রিভিউ হওয়া প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে ভারতের আইন অনুসরণ করলেও কিছু ক্ষেত্রে তা করছে না। না করা কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু সেটি যখন সাংঘর্ষিক হয়, তখন সমস্যা। ভারতেও আমৃত্যু মানে ৩০ বছরের কারাবাস। এছাড়া বাংলাদেশে একই রায়ের ওপর ভিন্ন ভিন্ন পর্যবেক্ষণ অনেক সময় দ্বিধায় ফেলে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞান ও ক্রিমিনাল জাস্টিস বিভাগের অধ্যাপক মোকাররম হোসেন বলেন, বর্তমানে দেশের যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলো একে অন্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নাকি পরিপূরক হয়ে কাজ করছে, বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। এ বিষয় নিয়ে আরো কাজ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক রেদওয়ানুল হক সভায় আগত দর্শকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

Facebook Comments