রাণীনগরে বিলীনের পথে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প

আপডেট : July, 14, 2017, 3:41 pm

ডেস্ক রিপোর্টঃ কালের আবর্তে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। বহুমুখী সমস্যা আর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আজ সংকটের মুখে এ শিল্প। তাই আধুনিকতার ছোঁয়ায় আজ বিলীনের পথে শত বছরের এই ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পটি।
উপজেলার খট্টেশ্বর, আতাইকুলা, কাশিমপুর, নিজামপুর, বেলঘরিয়াসহ বিভিন্ন গ্রাম ও এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য কুটিরের নয়নাভিরাম মৃৎশিল্পীদের বাসস্থান। যা সহজেই যে কারোর মনকে পুলকিত করে। এক সময় এ গ্রামগুলো মৃৎশিল্পের জন্য খুবই বিখ্যাত ছিল। বিজ্ঞানের জয়যাত্রা, প্রযুক্তির উন্নয়ন ও নতুন নতুন শিল্প সামগ্রীর প্রসারের কারণে এবং প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও অনুকূল বাজারের অভাবে এ শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা যায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো রাণীনগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে নিয়োজিত মৃৎশিল্পীদের অধিকাংশ পাল সম্প্রদায়ের। প্রাচীনকাল থেকে ধর্মীয় এবং আর্থ সামাজিক কারণে মৃৎশিল্পে শ্রেণীভুক্ত সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে অন্য সম্প্রদায়ের লোকেরা মৃৎশিল্পকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে। বর্তমান বাজারে এখন আর আগের মতো মাটির জিনিস পত্রের চাহিদা না থাকায় এর স্থান দখল করে নিয়েছে দস্তা, অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিকের তৈজসপত্র। ফলে বিক্রেতারা মাটির জিনিসপত্র আগের মতো আগ্রহের সাথে নিচ্ছেনা। তাদের চাহিদা নির্ভর করে ক্রেতাদের ওপর। কিন্তু উপজেলার অজপাড়াগাঁ পর্যন্ত এখন আর মাটির হাড়ি পাতিল তেমনটা চোখে পড়ে না। সে কারণে অনেক পুরোনো শিল্পীরাও পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছে।
যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে মাটির জিনিসপত্র তার পুরনো ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছে। ফলে এ পেশায় যারা জড়িত এবং যাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন মৃৎশিল্প তাদের জীবন যাপন
একেবারেই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। দুঃখ কষ্টের মাঝে দিন কাটলেও রাণীনগর উপজেলার মৃৎশিল্পীরা এখনও স্বপ্ন দেখেন। কোন একদিন আবারও কদর বাড়বে মাটির পণ্যের। সেদিন হয়তো আবারো তাদের পরিবারে ফিরে আসবে সুখ-শান্তি। আর সেই সুদিনের অপেক্ষায় আজও দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তারা।

এ ব্যাপারে উপজেলার খট্টেশ্বর পালপাড়া গ্রামের ধিরেন পাল বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদী-খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন মাটি সংগ্রহে অনেক খরচ করতে হয় তাদের। এ ছাড়াও জ্বালানির মূল্য বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে মিল না থাকায় প্রতিনিয়ত লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
এ ব্যাপারে রাণীনগর শের-এ বাংলা (ডিগ্রি) মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মো: মোফাখ্খার হোসের খাঁন পথিক মৃৎশিল্পের চলমান অবস্থা সম্পর্কে বলেন, মৃৎশিল্প আমাদের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী একটি শিল্প। সরকার কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধা প্রদান করে আসছে। কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ের মৃৎ শিল্পীদের কাছে এই সব সুবিধা কখনোই পৌঁছে না যার কারণে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে এই মৃৎশিল্পীরা। তাই অনেকেই বাপ-দাদার এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশার দিকে চলে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি ক্রেতাদের মাঝে নতুন করে এই মৃৎ শিল্পের পণ্যগুলোর চাহিদা সৃষ্টি করতে বিভিন্ন প্রকারের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
তিনি আরো বলেন দেশের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প বেঁচে থাকুক সরকার তা চায়। আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিল্পকর্মে প্রশিক্ষিত করে মৃৎশিল্পের সময়োপযোগী জিনিসপত্র তৈরিতে এবং বিদেশে এ পণ্যের বাজার সৃষ্টিতে জরুরি পদক্ষেপ অতীব প্রয়োজন।
এদিকে উপজেলার সচেতন মহল ও বিশিষ্টজনেরা মনে করছেন মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে এর বাজার সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা খুবই জরুরি।
Facebook Comments