রানা প্লাজার মালিক রানা নিজেই চাইলো ক্ষতিপূরণ

এপ্রিল ২৮ ২০১৭, ১৭:০৯

চার বছর আগে তার মালিকানাধীন রানা প্লাজা ধসে প্রাণ হারিয়েছেন সহস্রাধিক মানুষ। সেই রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা নিজেই দাবি করেছে ক্ষতিপূরণ। তবে সেটা ভবনটির মালিক হিসাবে নয়, একজন দোকান মালিকের পরিচয়ে। আর ক্ষতিপূরণ দাবির তালিকায় দোকান মালিকের নামের জায়গাতেও সে পুরো নামটি লেখেনি, লিখেছে ‘রানা’। তালিকায় ‘রানা’র নামে আটটি আর বেনামে ২০টি দোকানের তথ্য আছে।
সম্প্রতি রানা প্লাজা ধসের চার বছর পূর্তিতে ক্ষতিপূরণের দাবিতে সক্রিয় হয়ে ওঠা বিভিন্ন সংগঠনের কাছ থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
রানা প্লাজার দোকান মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল তৎকালীন এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে একটি আবেদনপত্র জমা দেওয়া হয়।

ওই আবেদনপত্রের সঙ্গে রানা প্লাজার ক্ষতিগ্রস্ত দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীদের নামের তালিকা সংযুক্ত করা হয়। তালিকায় রানা প্লাজার প্রথম তলায় ৫৯টি ও দ্বিতীয় তলায় ৫২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল।

ওই তালিকা অনুযায়ী, ‘রানা’র নামের দোকানগুলোর নম্বর হচ্ছে— ৩৪, ৪৭, ৪৮, ৫৪, ৫৫, ৭০, ১১১ ও ২০০। এছাড়া ১১, ১৩, ২৩, ২৪, ২৭, ২৮, ২৯, ৩০, ৩২, ৩৩, ৪১, ৪২, ৫৫, ৫৬, ৫৯, ৬০, ৬১, ৬৬, ৭৮ ও ৯২ নম্বর দোকানগুলোর  মালিকের নাম লেখা নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন দোকান মালিক জানান, এসব দোকানের মালিক সোহেল রানা নিজেই।

তালিকার প্রথম তলায় ১ নম্বর দোকানের মালিক মাহমুদুল হাসান আলাল। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম নেই। ১১ নম্বর দোকানের নাম ‘থ্রি পিছ হাউজ’, এর মালিকের নাম নেই। তালিকার ৪৭ নম্বর দোকানের নাম ‘এপোলো ডেন্টাল সাপ্লাই’, মালিক শাখাওয়াত হোসেন রনি। দোকান মালিকরা বলছেন, রান্না প্লাজার মালিক সোহেল রানার ভগ্নিপতি এই রনি। ‘ফ্রেন্ডস আইটি’ নামে ৪৮ নম্বর দোকানের ব্যবসায়ী রুবেল মিত্র। তিনি এখন সাভারের সিটি সেন্টারের ব্যবসায়ী।

রুবেল মিত্র  বলেন, ‘আমার মতো অনেকেই দোকানের পজেশন কিনে কোটি টাকা

ক্ষতির হয়েছেন।’

কম্পিউটার ওয়ার্ল্ডের ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম  বলেন, ‘রানা প্লাজার প্রথম তলায় ৭০ নম্বর দোকানটি ছিল আমার। রানাকে ২ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে দোকান চালু করে ৫০ হাজার টাকার মালামাল তুলেছিলাম। সেই দোকানের ব্যবসায়ী হিসাবে আমি ক্ষতিপূরণের দাবিদার।’ আর দোকান মালিক হিসেবে রানা দুর্ঘটনার পর থেকেই ক্ষতিপূরণ দাবি করে আসছে বলে জানান তিনি।

শ্রমিকের কান্নায় চাপা পড়ে যায় দোকানমালিক ও ব্যবসায়ীদের কান্না

রানা প্লাজা ধসের চার বছর পেরিয়ে গেলেও একটি টাকাও ক্ষতিপূরণ পাননি রানার কাছ থেকে পজেশন কিনে নেওয়া দোকান মালিকরা। এসব দোকানে পুঁজি খাটানো ব্যবসায়ীদের অনেকেই আজ মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

হক বোরখা হাউজের ব্যবসায়ী মামুন  বলেন, ‘ভবন ধসের নিচে চাপা পড়িনি। কিন্তু সারাজীবনের সঞ্চয়ে কেনা দোকান ও ব্যবসা হারিয়ে আর্থিকভাবে একেবারেই পঙ্গু হয়ে গেছি।’

ব্যবসায়ী শাহ জামাল বলেন, ‘আমরা তো কারও কাছে হাত পাততে পারি না। আমার অবস্থান কোথায় দাঁড়িয়েছে, একবার ভাবুন। আমাদের কথা কেউ বলে না।’

রানা প্লাজার প্রথম তলার ৫ নম্বর দোকানের মালিক ছিলেন রিপন মাহমুদ। দোকানের নাম ছিল মাসফি। ৩৮ লাখ টাকায় পজেশন আর ১৮ লাখ টাকার  পণ্য কিনে ব্যবসা করছিলেন তিনি। বলতে গেলে তার সারাজীবনের সঞ্চয়ই ছিল ওই দোকানে। সবই হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন তিনি। একইভাবে ১৮, ১৯  ও ২০ নম্বর দোকানের মালিক স্বপনের ক্ষতি কোটি টাকারও বেশি। একইভাবে রানা প্লাজার প্রথম ও দ্বিতীয় তলার প্রায় ২শ’ ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭০ কোটি টাকা।

রানা প্লাজার দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণের দাবি প্রসঙ্গে সাবেক এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক  বলেন, ‘দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীরা আমার কাছে এসেছিলেন। তাদের জন্য চেষ্টা করেছি। কিন্তু পরে আর বিষয়টি সামনে আগায়নি। পরে কী হয়েছে তাও বলতে পারব না। এতদিন পর কারা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন আর কারা পাননি— তার কিছুই আর মনে নেই।’

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>