শেখ হাসিনাকে তৃণমূল নেতারা: জনবিচ্ছিন্ন এমপিদের মনোনয়ন দেবেন না

মে ২১ ২০১৭, ১০:০৩

আওয়ামী লীগে খন্দকার মোশতাকরা আগেও ছিল, এখনো আছে। আজ আওয়ামী লীগের রন্ধ্রে রন্ধ্রে খন্দকার মোশতাকরা ঢুকে গেছে। নেত্রী, আপনি এদের বারবার মাফ করে দেন। ফলে অপরাধীরা সাহস পেয়ে যায়। এদের আর মাফ করবেন না। স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে দেখেছি অশুভ প্রতিযোগিতা। আমরা একদল আপনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছি, আরেক দল আপনাকে পেছনের দিকে টানছে। ’ গতকাল শনিবার আওয়ামী লীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম বিশেষ বর্ধিত সভায় দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে এমন ক্ষোভ জানান ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জহিরুল হক খোকা।

সকালে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত এ সভায় শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে সংগঠন নিয়ে নিজেদের অসন্তোষের কথা তুলে ধরেন খোকাসহ তৃণমূলের অন্য নেতারা। আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো কালের কণ্ঠকে এসব তথ্য জানিয়েছে।

খোকা আরো বলেন, ‘ব্যক্তিগত স্বার্থে দলের মধ্যে গ্রুপিং সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে হবে। আগামী নির্বাচনে জাতীয়ভাবে কাজকর্মই শুধু জনগণ বিবেচনা করবে না, স্থানীয়ভাবে এমপিরা কে কী করছেন, সেই প্রশ্নও আসবে? সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ’

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, সভায় এমপিদের সমালোচনা করেন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সিটি মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। দলীয় সভাপতিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘সিলেট বিভাগে আপনি যাঁদের মনোনয়ন দিয়েছেন তাঁদের বিজয়ী করতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অনেক কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁদের সঙ্গে সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীদের ফারাক তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষ বা নেতাকর্মীরা তাঁদের কাছে যেতে পারে না। আগামী নির্বাচনে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। ’ দলের সহযোগী সংগঠনের ওপর ক্ষোভ ঝেড়ে তিনি বলেন, ‘সহযোগী সংগঠনগুলো কমিটি দেওয়ার সময় আমাদের জানায় না। আমরা চিনি না এমন অনেকে কমিটিতে স্থান পায়। আগামীতে এই ধারা অব্যাহত থাকলে সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ’

গণভবনে শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সকাল সাড়ে ১০টায় বিশেষ বর্ধিত সভা শুরু হয়। সভায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ, জাতীয় পরিষদ এবং সব পূর্ণাঙ্গ জেলা ও মহানগর কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, দপ্তর সম্পাদক, উপদপ্তর সম্পাদক, প্রচার সম্পাদক ও উপপ্রচার সম্পাদক এবং আহ্বায়ক কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা অংশ নেন। সভায় মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও সংসদ সদস্যরাও অংশ নেন।

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, সভায় আট বিভাগ থেকে আটজন নেতা বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পান। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে সাংগঠনিক নানা সমস্যা, এমপিদের জনবিচ্ছিন্নতা, দলের মধ্যে অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে সমস্যা, আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাদের ওপর ক্ষোভসহ বিভিন্ন বিষয়। তৃণমূল নেতাদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে শেখ হাসিনা দলীয় সংসদ সদস্যদের জেলার নেতাদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার নির্দেশনা দেন। আগামী নির্বাচনের জন্য এখন থেকেই ব্যাপক প্রচার শুরু করতে তৃণমূলের নেতাদের নির্দেশ দেন তিনি। দলের মধ্যে নিজের পাল্লা ভারী করতে জামায়াত-বিএনপি থেকে নেতাকর্মীদের আওয়ামী লীগে না টানতেও নির্দেশ দেন তিনি।

সূত্রগুলো জানায়, সভায় খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হারুন উর রশীদ দলীয় সভাপতিকে উদ্দেশ করে বলেন, “নেত্রী, আপনি দলের মধ্যে শৃঙ্খলা এনে দিন। তাহলে আমাদের ক্ষমতায় আসার জন্য আর ‘শেখ হাসিনার সরকার, বারবার দরকার’ এই স্লোগান দিতে হবে না। আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে দেখেছি আপনি একজনকে মনোনয়ন দেন, কিন্তু নৌকার বিরুদ্ধে আরেকজন দাঁড়িয়ে যায়। দলে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। ” আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর ওপর ক্ষোভ ঝেড়ে তিনি আরো বলেন, ‘আমার জেলায় সহযোগী সংগঠনের কমিটি হয়, অথচ আমি জানি না। তাঁরা সবাই কমিটি দেন ঢাকায় বসে। ’ দলের পক্ষ থেকে একজন মুখপাত্রের ভূমিকায় থাকা উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘বেশি লোক দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বললে কথা এক থাকে না। এতে আমরা বিব্রত হই। ’

রংপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজু বলেন, ‘জেলার বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের কমিটি কিভাবে হয় আমরা জানি না। জেলা-উপজেলার কমিটি ঢাকা থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় আমাদের জড়িত না করার ফলে জামায়াত, শিবির ও বিএনপির সক্রিয় নেতাকর্মীরাও সংগঠনে জায়গা পেয়ে যায়। ’ এমপিদের সমালোচনা করে রাজু আরো বলেন, ‘এমপিরা নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের বলয়ের বাইরে বের হতে পারেন না। বলয়ের কারণে অমুক-তমুককে দিয়ে কমিটি দেওয়া হয়। জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের পতাকাতলে সমবেত হয়। তারা কাদের ছত্রচ্ছায়ায় আওয়ামী লীগে ঢুকছে, সেটা তদন্ত করে দেখতে হবে। এগুলো শক্ত হাতে দমন না করলে আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীরা টিকে থাকতে পারবে না। ’

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের সরকারের টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার ফলে যে উন্নয়ন হয়েছে সে হিসেবে আমরা জাগরণ সৃষ্টি করতে পারিনি। আমাদের এমপিদের সঙ্গে নেতাকর্মীদের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে তা দূর করতে হবে। সহযোগী সংগঠনের নেতারা ঢাকায় বসে কমিটি দেন। আমাদের ওখানে দুই-একজন নেতা আছেন, যাঁরা ভুঁইফোড় সংগঠন অর্থাৎ দোকান খুলেছেন। তাঁরা সংগঠনের কর্মসূচিতে আসেন না, কিন্তু নিজের অনুসারীদের নিয়ে দোকানের ব্যানারে প্রগ্রাম করে তা গণমাধ্যমে প্রচার করেন। তাঁদের কারণেও সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ’

রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘দ্বন্দ্ব আছে, তবে দ্বন্দ্বের কথা নয়, আমি বলব ঐক্যের কথা। দ্বন্দ্ব থাকতেই পারে, তবে নিরসনের উপায় বের করতে হবে। ’

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, তৃণমূলের নেতাদের বক্তব্যের পর শেখ হাসিনা সমাপণী বক্তব্যে বলেন, ‘সামনে নির্বাচন আছে। নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা ব্যাপকভাবে করতে চাই। আওয়ামী লীগ এত বড় সংগঠন, এই সংগঠনের অনেক জেলা, উপজেলা, ইউনিয়নে একটা অফিসও নেই। অনেক ভালো ভালো জেলা, সেখানে বেশ অর্থবিত্তশালী নেতারা আছেন। কিন্তু সেখানে ভালো অফিস নেই। আমি চাই প্রত্যেক জেলায় আমাদের একটা নিজস্ব অফিস থাকবে। সে জন্য কোনো সহযোগিতা লাগলে আমরা করব। ’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখন ডিজিটাল যুগ। আমরা যেন সবার সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ করতে পারি। সে জন্য অফিসে ব্যবস্থা রাখতে হবে। সিআরআই (সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন) নেতাকর্মীরা যে তথ্য চেয়েছে তা দেবেন। আপনাদের কোনো তথ্য দরকার হলে সিআরআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। ’

নির্বাচনের প্রচারণার ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা কী কী ভালো কাজ করলাম তা জনগণকে জানাতে হবে। আমাদের অনেক সংসদ সদস্য আছেন, যাঁদের জেলার নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ নাই। তাঁদের বলব, জেলা নেতাদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে হবে এবং উন্নয়নের কথাগুলো মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে। আমরা সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু করলাম। এ অভিযান পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। জেলার নেতারা উপজেলায়, উপজেলার নেতারা ইউনিয়নে এবং ইউনিয়নের নেতারা ওয়ার্ডে যাবেন। এভাবে সদস্য সংগ্রহ করবেন। ’

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি নিজে একটা সার্ভে করেছি। সেখানে দেখেছি, বহু জায়গায় আগে যারা আমার নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন করেছে, নানা অপরাধ করেছে তাদের দলে নেওয়া হয়েছে। গ্রুপিং ভারি করার জন্য অনেকে তাদের দলে নিয়েছেন। ’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এরা দলে এসেছে কেন? এমনকি যারা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরে জ্বালাও-পোড়াও করেছে তাদের অনেকে দলে এসেছে। দলে যোগদানের পর অনেকে আমাদের নেতাকেও হত্যা করেছে। কাজেই গ্রুপের স্বার্থে, নিজের দল ভারি করার স্বার্থে এসব আবর্জনা দলে স্থান দেওয়া যাবে না। কার মাধ্যমে আসছে, এখানে নামটা না বলি, তাঁরা যদি এ

পথ না ছাড়েন তাঁরা কিন্তু আগামী দিনে নেতৃত্ব পাবেন না। ’

তিনি বলেন, কিছু লোক থাকে পারমানেন্ট সরকারি দল। যে দলই ক্ষমতায় আসুক তারা ক্ষমতায় থাকে। এরা আসে কমিশন খাওয়ার জন্য। আওয়ামী লীগে যথেষ্ট সামর্থ্য আছে, লোকবল আছে। এসব লোককে দলে কোনো দরকার নেই। এ ব্যাপারে সবাইকে সজাগ থাকার অনুরোধ করছি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তৃণমূলে দলের মনোনয়ন নিয়ে জালিয়াতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মনোনয়নের ক্ষেত্রে আপনারা অনেকে কেন্দ্রে মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত পাঠান নাই। অনেকে সে সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছেন। এটা ঠিক নয়। সিদ্ধান্ত পাঠানোর ক্ষেত্রে মিটিংয়ের বিষয়াদি সবার স্বাক্ষরসহ পাঠাবেন। ’

সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘নৌকা প্রতীক যাঁদের আমরা দেব তাঁদের পক্ষে সবাইকে কাজ করতে হবে। নৌকা প্রতীকের বাইরে কেউ কাজ করবেন না। এ বিষয়ে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেবেন। ’

সূত্রগুলো জানায়, নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় হওয়ার নির্দেশনা দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘একটা করে ল্যাপটপ দেওয়া হচ্ছে। দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব হবে সেটির মাধ্যমে যোগাযোগ রাখা এবং তথ্য সংগ্রহ করা। আমাদের যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড মানুষকে দেখাতে হবে। বিএনপি-জামায়াত জোট কী অত্যাচার করেছে, কিভাবে মানুষ খুন করেছে, মানুষ পুড়িয়েছে সেগুলো মানুষকে জানাতে হবে। ’

আসন্ন বাজেটের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, উন্নয়নমূলক বাজেট দিচ্ছি। বাজেট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই এটিকে স্বাগত জানিয়ে নিজেদের এলাকায় মিছিল, মিটিং করবেন। দলীয় সূত্রগুলো জানায়, প্রতিবছর একটি করে সাংগঠনিক রিপোর্ট পাঠাতে জেলা নেতাদের নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।

সভায় প্রথমে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্বাগত বক্তব্য দেন। এরপর কোরআন তেলাওয়াত, গীতা ও ত্রিপিটক থেকে পাঠ করা হয়। পরে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সূচনা ভাষণ দেন। তারপর আওয়ামী লীগের সদস্য সংগ্রহ অভিযান উদ্বোধন করেন তিনি। এ সময় নিজের সদস্যপদও নবায়ন করেন। ২০ টাকা মূল্যের ফরম ৫০০ টাকা দেবেন বলে জানান। প্রতিটি কাউন্সিলের পর সদস্যপদ নবায়ন করতে হয় জানিয়ে সবাইকে নিজেদের সদস্যপদ নবায়ন করার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শফিউল আলম ভূঁইয়া এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারজানা আওয়ামী লীগের সদস্য হন। পরে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের ৭৮টি সাংগঠনিক জেলাকে একটি করে ল্যাপটপ উপহার দেওয়া হয়। আট বিভাগের আট নেতাকে মঞ্চে ডেকে তাদের হাতে ল্যাপটপ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।

বাইরেও ক্ষোভ ঝাড়ল নেতাকর্মীরা : ঢাকায় অবস্থান করে কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাকে প্রভাবিত করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন বাগিয়ে নেওয়া হয়েছিল আওয়ামী লীগ থেকে। ক্ষমতা পাওয়ার পর উন্নয়নের বদলে এসব মন্ত্রী ও এমপি সরকারি বরাদ্দ লুটপাট, নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন দুর্নীতি করে পকেট ভারী করেছেন।

গতকাল গণভবনের ভেতর যখন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বিশেষ বর্ধিত সভা চলছিল, তখন বাইরে অপেক্ষমাণ নেতাকর্মীরা এসব অভিযোগ তুলে ধরে। বর্ধিত সভায় অংশ নেওয়া জেলা নেতাদের কাছে এসব বিষয় খোলাখুলিভাবে বলার জন্য বাইরে অপেক্ষা করছিল ক্ষুব্ধ সাধারণ নেতাকর্মীরা।

সকাল ১১টার দিকে গণভবনের সামনে খোলা অংশে ভিড় বাড়ে ক্ষুব্ধজনদের। তারা দলে কোনো পদ চায় না, সুবিধাও চায় না। তারা চায় দল আবার ক্ষমতায় যাক। তবে তার আগে যেন দল শৃঙ্খলায় আসে—এটাই তাদের বড় চাওয়া। তাদেরই একজন মামুন আহমেদ। পকেটে ৫০০ টাকা ছিল নিত্যব্যবহারের জরুরি একটি পণ্য কেনার জন্য। নিজের ভাইয়ের দেওয়া ওই টাকায় পণ্যটি না কিনে সিএনজি অটোরিকশায় উঠে যাত্রাবাড়ী থেকে সোজা চলে এসেছেন গণভবনের সামনে। ভেতরে বর্ধিত সভায় যোগ দিতে আসা ভোলা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুল কাদের মজনু যেন দলীয় সভাপতির কাছে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের দূরত্ব ঘোচাতে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন, তা বলতেই ছুটে এসেছেন মামুন।

এলাকার মানুষের উন্নয়নের কথা বলে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন নিয়ে এলাকায় যাচ্ছেন না, ঢাকায় বসে ব্যবসা করেন—এমন এমপিদের যাতে আর মনোনয়ন না দেওয়া হয় এই সুপারিশ করেন মামুন।

মামুন ঢাকায় ভাইয়ের বাসায় আছেন। জানালেন ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তিনি। কথা বলতে বলতে নিজের ভাই ইব্রাহীমের ছবি বের করে বললেন, ‘আমি ইব্রাহীমের ভাই। ’ যুবলীগ নেতা ইব্রাহীমকে হত্যা করা হয়েছিল ২০১০ সালের ১৩ আগস্ট। ইব্রাহীম ঢাকার ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ছিলেন।

মামুন বলেন, ‘আমরা দলের বড় পদ চাই না। দলের ভালো চাই, নেত্রীর ভালো চাই। বর্ধিত সভা শেষ হওয়ার পর ফজলুল কাদের মজনুর দেখা হলে কথা বলেন মামুন। মজনু কালের কণ্ঠকে বলেন, মামুন নিহত ইব্রাহীমের ভাই। তাঁর (মামুন) সঙ্গে পরিচয় দীর্ঘদিনের। বর্ধিত সভায় তিনি নিজে কথা বলতে পারেননি। তবে বরিশাল বিভাগের পক্ষ থেকে বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি, সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ বক্তব্য রেখেছেন। তিনি রোজায় বরিশালে দলকে আরো গোছানো হবে বলে জানিয়েছেন।

ঢাকায় অবস্থানরত বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলার আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা জানান, ঝালকাঠি থেকে সংসদ সদস্য হলেও বি এইচ হারুন এলাকায় যান না। দলের কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের প্রভাবিত করে তিনি মনোনয়ন নিয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে যোগ্য ও ত্যাগী নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ। সম্প্রতি রাজধানীর বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই তরুণী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। হারুন ওই হোটেলের মালিক।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলা থেকে আসা স্থানীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ইফতেখার আহমেদ সবুজ গণভবনের সামনে এসে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের খুঁজছিলেন। কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও দৌলতপুর আওয়ামী লীগে কোন্দল চরমে। এ কোন্দল রোধে এক মাস আগে ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ে শীর্ষ নেতাদের ডাকা হয়েছিল। সবুজ বলেন, দৌলতপুরে সাবেক সংসদ সদস্য আফাজ উদ্দিন আহমেদ ১৯৭৫ সাল থেকে আওয়ামী লীগ করছেন। ২০১৪ সালে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা যড়যন্ত্র করে তাঁকে ফেল করিয়েছেন। সবুজ জানান, এবার নির্বাচনে কুষ্টিয়া-১ আসন বা দৌলতপুর আসনে যাতে যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয় সে জন্য দাবি জানাতে এসেছি। প্রায় তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে পরে সবুজ কাঙ্ক্ষিত নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।

গণভবনে বর্ধিত সভা চলা অবস্থায় ভেতর থেকে বের হয়ে আসেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা। এর মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক জহির হাসান চৌধুরী বললেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের এমপি গোলাম রব্বানী সিন্ডিকেট করে গম বাণিজ্য করছেন। তিনি এলাকায় সন্ত্রাস করছেন। তিনি নিজেও অস্ত্র ছাড়া বের হতে পারেন না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জামায়াত ও শিবিরকর্মীদের নিয়োগ দিয়েছেন। এদের হাত থেকে দল বাঁচাতে হবে।

তবে কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানীকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীদের সঙ্গে মন্ত্রী-এমপিদের দূরত্ব বাড়ছে। জেলা ছাত্রলীগের কমিটিতে আছে শিবিরের কর্মীরা। এই ক্ষোভ নিয়ে গণভবনের সামনে বসেছিলেন নিজাম উদ্দিন। তিনি জানালেন, দুই বছর ছাত্রলীগের ওই কমিটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিদ্রোহ করেছেন। ফল হয়নি। শেষে আওয়ামী লীগের কর্মী হয়ে কাজ করতে শুরু করেছেন। তাঁর বাড়ি সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ডৌবারী ইউনিয়নে। ওই ইউনিয়ন থেকে তিনি এক বছর আগে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছিলেন। বললেন, সিলেট জেলার সব আসনেই আওয়ামী লীগের অবস্থা খারাপ। নির্বাচনে জিততে হলে তাই শুধু উন্নয়নের প্রচার নয়, দূরত্ব ঘোচাতে হবে।

Facebook Comments

<a href=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/infra-add.jpg” target=”_blank” rel=”noopener”><img src=”http://barisallive24.com/wp-content/uploads/2017/05/Hoopers1.jpg” width=”331″ height=”270″ /></a>