ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে সংসদে ক্ষোভ, রায় পুনর্বিবেচনার দাবি

আপডেট : July, 10, 2017, 10:49 am

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া আপিল বিভাগের রায়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্যরা। রায় পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাত থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার রায় ও এজন্য অ্যামিকাস কিউরিদের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেন সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা।

রোববার সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেন জাসদের সংসদ সদস্য মঈনুদ্দিন খান বাদল। এ সময় অধিবেশন কক্ষে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন।

মঈনুদ্দিন খান বাদল বলেন, সারা জীবনের একটি অংশ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সম্প্রতি এমন কিছু সিদ্ধান্ত আমরা দেখছি, যেগুলো একান্ত অবিবেচনাপ্রসূত। বিচার বিভাগ ও সুপ্রিম কোর্ট যে ৯৬ ধারা বাতিল করেছেন, যা প্রকৃত সংবিধানে ছিল, সেটা কোথায়? সে বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য চাইব। আমার প্রশ্ন, সংসদে কোনো আইন পাস হলে বিচার বিভাগ কি বাতিল করে দিতে পারে? বেসিক স্ট্রাকচার কি নষ্ট করতে পারে? বেসিক স্ট্রাকচারের বিষয়ে আমাদের একমত হতে হবে। ৭২ সালের সংবিধান অনুসারে আমরা ৯৬ ধারাকে পুনঃস্থাপন করেছিলাম। কিন্তু ওই ধারায় কোথায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হস্তক্ষেপ হয়েছে, সেটা বলতে হবে। এই সংসদ কবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করেছে। এই সংসদ কি বিচার বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করেনি। তাদের সুদৃঢ় অবস্থানের জন্য যা যা করণীয় তা বর্তমান সংসদ করে গেছে। তাহলে সমস্যা কোথায়? এখানে যদি কোনো বিচারক অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান, তাহলে তার বিচার কে করবে? আমি বলতে চাই, বিচার বিভাগ কি সংবিধানের ঊর্ধ্বে?

তিনি আরো বলেন, আপনারা জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত আইন, জিয়াউর রহমানের আমল ও ক্ষমতাগ্রহণকে অন্যায় অবৈধ ঘোষণা করেছেন। ওগুলো অবৈধ আর তার আমলে করা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কি বৈধ হয়ে গেল? বিচারক অন্যায় করলে কীভাবে অপসারিত হবে? কমন ওয়েতে ২-৩ পদ্ধতি আছে, সেটা করতে কোন জায়গায় বেসিক স্ট্রাকচারের ব্যত্যয় ঘটেছে, জবাব চাইব।

জাতীয় পার্টির নেতা জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, এক অ্যামিউকাস কিউরি ১/১১ এর সময় কালো টাকা সাদা করেছিলেন। আজকে সেই অ্যামিউকাস কিউরি নীতির কথা বলেন। এই সংসদ নতুন কিছু করে নাই। যা ছিল সেটাই পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। পৃথিবীতে এমন কোন দেশ আছে, যেখানে সংসদ থাকা সত্বেও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল রয়েছে? জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস। এই পার্লামেন্টে স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ করার ক্ষমতা রাখে, সেখানে বিচারকরা সকল কিছুর ঊর্ধ্বে কী করে হয়। এই পার্লামেন্ট নতুন কিছু করেনি।

তিনি আরো বলেন, প্রধান বিচারপতিসহ সুপ্রিম কোর্টের সব বিচারপতি সেনাশাসিত সরকারের সকল সংশোধনকে বাতিল করেছিলেন। সেখানে কীভাবে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল থাকে? প্রধান বিচারপতি যদি কোনো অপরাধ করেন তার বিচার অন্য

বিচারপতিরা করবে, এটা কী করে হয়? তাই আমরা ৭২ সংবিধান পুনঃস্থাপন করেছি মাত্র।

এই রায় বিবেচনার আহ্বান জানান জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আদালত অবৈধ ঘোষণা করেছেন। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিচারপতিদের বিচার করবে। আমার প্রশ্ন- প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ আসলে তার অধিনস্তরা কি তার বিচার করতে পারবে?

তিনি আরো বলন, এই সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে তারা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলেছে। সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ। সেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। আইপিইউ-সিপিএর চেয়ারম্যান এই সংসদের সদস্য। এখানে আমরা রাষ্ট্রপতিকে ইমপিচ করতে পারি, বাট তাদের করা যাবে না। জিয়াউর রহমান আইয়ুব খানকে অনুসরণ করে সপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল করেছেন। এখন সেটার রক্ষা করার জন্য উঠে পরে লেগেছেন। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী পদক্ষেপ নেবেন। অ্যামিকাস কিউরিরা ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছেন। তারা বলেছেন, বেশিরভাগ দেশেই এই পদ্ধতি নেই। পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল থাকবে কীভাবে?

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আদালত বাতিল করেছেন, এ বিষয়ে কিছু বলা নেই। কিন্তু যারা সমর্থন করেছেন, তাদের নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। তারা সুবিধাবাধী। আপনি সংবিধানের প্রণয়নের সময় বললেন, বেস্ট সংবিধান, বাট এখন কার বিরোধিতা করছেন? কারণ, আপনারা সংসদ সদস্য হতে পারেননি।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, রক্তের বিনিময়ে এই সংবিধান। ১৯৭২ সালের সংবিধানে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ছিল না। সেখানে ছিল সংসদ করবে বিচারপতির বিচার, যদি তারা অন্যায় করে। অন্যায় না করলে কীসের ভয়? আমি জানতে চাই, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে আজ পর্যন্ত কতজন বিচারপতির বিচার করেছেন? একজনেরও না। বরং কারো বিরুদ্ধে তদন্ত করা হলে তা বন্ধ করে দিয়েছেন। আমার কাছে, তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, সংসদ রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী কিংবা স্পিকারের বিচার করতে পারবে। কিন্তু বিচারপতিরা কি জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে হয়। বিচারপতিদের নিযোগ দেন রাষ্ট্রপতি। ইংল্যান্ড ও ভারতসহ সব গণতান্ত্রিক দেশে বিচারপতিদের ইমপিচমেন্টের দায়িত্ব সংসদের। তাহলে কী কারণে আপনারা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থাকতে চান? আপনারা রাজনৈতিক বক্তৃতা দিতে পারেন না। ওই অ্যামিকাস কিউরিরা হচ্ছেন সুবিধাভোগী। তারা আইনের মারপ্যাঁচ লাগিয়ে সুবিধা নিতে চান। বিচার বিভাগ স্বাধীন, কিন্তু কতটুকু? সেটা পার্লামেন্টের চেয়ে বেশি হতে পারে না। আপনারা রায় দিয়েছেন, কিন্তু সংসদ যতক্ষণ না পাস করবে, ততক্ষণ তা কার্যকর হবে না। তাই রায় দিতে থাকেন, লাভ নেই।

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, এই সংবিধান বেস্ট সংবিধান। চিফ জাস্টিস অন্যায় করতে পারেন, তার বিচার কে করবে? এই রায় অন্যায়। অ্যামিকাস কিউরিরা সুবিধাবাদীর মতো কথা বলেন। তারা ভুল করেছেন। এটার রিভিউ করতে হবে।

আলোচনায় আরো অংশ নেন সংসদ সদস্য আলী আশরাফ, রাশেদ খান মেনন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু প্রমুখ।

Facebook Comments