সাপে কামড়ালে কী করবেন, কী করবেন না

জুলাই ১৪ ২০১৭, ১৬:০৯

সাপকে ভয় পায় না এমন মানুষ সম্ভবত কমই আছে। সাপ কিন্তু এমনিতেই মানুষকে কামড়ায় না। তাকে বিরক্ত করলে কিংবা সে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে আছে মনে করলে শত্রুকে কামড় বসিয়ে দেয়।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে বসতঘরে বিষধর গোখরা সাপের উপদ্রব বেড়েছে। ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, মানিকগঞ্জসহ বেশকিছু জায়গায় বাড়িতে সাপের উপদ্রবের খবর পাওয়া গেছে।

সাপের বিষ মারাত্মক। প্রাণকে নিষ্প্রাণ করে দেয় এ বিষ। তবে সব সাপ বিষধর নয়। বিষধর ও নির্বিষ উভয়ের কামড়ে মেডিকেল কিংবা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। উইকি হাউ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী আসুন সাপের কামড়ের চিকিৎসা সম্পর্কে জেনে নিই।

বিষাক্ত সাপের কামড়ের চিকিৎসা
* জরুরি সেবা নম্বরে ফোন করুন অথবা সাহায্যের জন্য কাউকে ডাকুন। আপনি যদি একা হন তাহলে সাহায্য পেতে এগিয়ে চলুন। বেশিরভাগ সাপের কামড় মারাত্মক হয় না। বিষাক্ত সাপে কামড়ালে যত দ্রুত সম্ভব মেডিকেল সেবা নেওয়া বাধ্যতামূলক।

* সাপে কাটা স্থান দেখে আপনার নিশ্চিত হওয়া জরুরি নয় যে, সাপটি বিষাক্ত কিনা কিংবা ক্ষতটি কেমন। ক্ষত যেমনই হোক, আপনার সর্বোত্তম কাজ হবে যত দ্রুত সম্ভব মেডিকেলের শরণাপন্ন হওয়া। যথাসাধ্য শান্ত থাকুন। আতঙ্ক বা ভয় আপনার হৃদকম্পন বাড়িয়ে দেবে। যদি সাপটি বিষধর হয় তাহলে হৃদকম্পনের কারণে আপনার শরীরে দ্রুত বিষ ছড়িয়ে পড়বে। তাই সর্বোচ্চ পর্যায়ের শান্ত থাকুন।

* যে সাপ কামড়েছে তা দেখতে কেমন তা স্মরণ রাখুন। কেননা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসককে সাপের বর্ণনা জানাতে হয় যাতে নির্ধারণ করা যায় সাপটি বিষাক্ত কিনা। যদি সম্ভব হয় সাপের ছবি তুলে রাখুন। সাপ ধরার চেষ্টা করবেন না। আপনি যদি সাপ ধরায় অভিজ্ঞ না হন তাহলে আবারো কামড় খেতে পারেন। সাপ খুব দ্রুত চলাচল করতে পারে। সাপকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য সামনে এগিয়ে যাবেন না অথবা সাপটির পরিচয় নিশ্চিত হতে গিয়ে প্রচুর সময় নষ্ট করবেন না। সাধারণ দেখায় যা দেখার দেখে নিন ও স্থান ত্যাগ করুন।

* সাপ থেকে দূরে সরে যান। আপনাকে তৎক্ষণাৎ সাপের সীমানা থেকে দূরে যেতে হবে। তাহলে দ্বিতীয়বার কামড় খাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। নিরাপদ জায়গায় চলে যান। দৌড়াবেন না। দৌড়ালে বা খুব দ্রুত হাঁটলে আপনার হার্ট দ্রুতগতিতে পাম্পিং করবে যার ফলে বিষ দ্রুত সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়বে। এমন জায়গায় চলে যান যেখানে সাপটি আসার আর সম্ভাবনা নেই। নিরাপদ স্থানে গিয়ে যথাসম্ভব শান্ত থাকার চেষ্টা করুন।

* আহত স্থানকে স্থির রাখুন। রক্ত পড়া অব্যাহত থাকতে দিন। টার্নিকেট (রক্ত পড়া বন্ধ করার ব্যান্ডেজ বা এ জাতীয় কিছু) ব্যবহার করবেন না। ক্ষতস্থানের নড়াচড়া বন্ধ রাখুন। ক্ষতস্থানকে হার্ট লেভেলের নিচে রাখুন। এর ফলে সাপ বিষাক্ত হয়ে থাকলে বিষ ছড়ানো কমে যাবে। ক্ষতস্থানকে হার্ট লেভেলের নিচে রাখার ফলে হার্টের দিকে দূষিত রক্তের প্রবাহ কমবে। ক্ষতস্থানকে নড়াচড়া থেকে বাঁচাতে স্প্লিন্ট ব্যবহার করুন। এর জন্য লাঠি, কাঠ বা তক্তা আহত স্থানের উভয় পাশে কাপড় দিয়ে বেঁধে দিন।

* পোশাক, অলংকার বা অন্যান্য উপকরণ সরিয়ে ফেলুন। বিষধর সাপে কামড়ালে আহত স্থান দ্রুত বিষম ফুলে যেতে পারে। ফুলতে থাকলে ঢিলা পোশাকও টাইট হয়ে যাবে।

* ক্ষতস্থান পরিষ্কার করুন, কিন্তু পানিতে ভেজাবেন না। পরিষ্কার কাপড় পানিতে ভিজিয়ে আহত স্থান ধীরে ধীরে পরিষ্কার করুন। পরিষ্কার করা শেষে এটিকে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ঢেকে দিন।

* মেডিকেল সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করুন বা এগিয়ে যান। যত দ্রুত সম্ভব মেডিকেল সাহায্য পেতে চেষ্টা করুন। ক্ষতস্থান অল্পমাত্রায় ফুললে বা না ফুললে ধারণা করতে পারেন সাপটি বিষাক্ত ছিল না। যদিও ক্ষতস্থানে ইনফেকশন বা মারাত্মক রিয়েকশনের (যেমন- অ্যালার্জিক রিয়েকশন) আশংকা থেকে যায়। তাই আপনার মেডিকেল সেবা নেওয়া উচিত।

* অবস্থাকে খারাপ করে এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন না। ক্ষতস্থানের যত্নে কিছু অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি চালু আছে যা আপনার অবস্থাকে আরো খারাপ করে দেবে। ক্ষতস্থান কেটে বা শুষে বিষ বের করার চেষ্টা করবেন না। ক্ষত কাটলে আরো সমস্যার সৃষ্টি ও ইনফেকশন হতে পারে। কেউ শুষে বিষ বের করতে গিয়ে বিষ গিলে ফেলতে পারে। এতে তারা বিষাক্রান্ত হয়ে যাবে। ক্ষতস্থানে টার্নিকেট বা বরফ ব্যবহার করবেন না।

বিশেষজ্ঞরা মত দেন, টার্নিকেট রক্তপ্রবাহকে খুব বেশি বাধাগ্রস্ত করবে এবং বরফ ক্ষতকে বাড়িয়ে দেবে। অ্যালকোহল বা ক্যাফেইন পান করবেন না। এটি আপনার হৃদকম্পনকে বাড়িয়ে দেবে ও বিষকে শরীরে ছড়িয়ে দেবে। পানি পানে হাইড্রেটেড থাকুন।

* আপনার মেডিকেল সেবা সম্পর্কে ধারণা থাকা উচিত। ইমার্জেন্সি রুমে আপনার ফোলা, ব্যথা বা অন্যান্য উপসর্গের চিকিৎসা করবে। উপসর্গের মধ্যে আছে বমি বা বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, শ্বাসক্রিয়া বা গিলায় সমস্যা ইত্যাদি। ইমার্জেন্সি রুমে আপনার রক্তচাপ, রক্ত বা স্নায়ু প্রক্রিয়ায় সমস্যা হচ্ছে কিনা, অ্যালার্জিক রিয়েকশন ও ফোলা এসব বিষয়ে খেয়াল রাখবে। উপসর্গের উপর ভিত্তি করে আপনার চিকিৎসা করা হবে। যদি কোনো উপসর্গের সম্মুখীন না হন তাহলে আপনাকে ২৪ ঘন্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। কিছু ক্ষেত্রে উপসর্গ দীর্ঘ সময় পর দেখা দেয়। বিষধর সাপে কামড়ালে

আপনাকে অ্যান্টিভেনিন বা অ্যান্টিভেনম দেওয়া হবে। এটি অ্যান্টিবডির সমন্বয় যা সাপের বিষকে প্রতিরোধ করবে। প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু উভয়ের ক্ষেত্রে এটি নিরাপদ ও কার্যকর। উপসর্গের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে আপনাকে এক ডোজেরও বেশি দেওয়া হতে পারে। আপনাকে ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক খেতে বলা হতে পারে যাতে ক্ষত ইনফেকশনে পরিণত না হয়। টিটেনাসও দেওয়া হতে পারে। মারাত্মক ক্ষতের জন্য সার্জারি আবশ্যক।

* ক্ষত চিকিৎসা অব্যাহত রাখুন ও ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলুন। হাসপাতাল থেকে রিলিজের পর আপনার প্রধান করণীয় হবে ক্ষতস্থান পরিষ্কার ও ঢাকা রাখা এবং মেডিকেল নির্দেশিকা মেনে চলা। কিভাবে ড্রেসিং পাল্টাতে হয়, কিভাবে ক্ষত পরিষ্কার করতে হয় ও কিভাবে সম্ভাব্য ইনফেকশন চিনতে হয় এসব নির্দেশিকায় উল্লেখ থাকে। ক্ষতস্থানে সম্ভাব্য ইনফেকশনের লক্ষসমূহ হল- ফোলা, ছোঁয়ামাত্র ব্যথা, লাল হয়ে যাওয়া, পানি ঝরা, তাপ অনুভূত হওয়া ইত্যাদি। এসব লক্ষণ দেখা দিলে অথবা জ্বর আসলে শিগগির ডাক্তারকে ডাকতে হবে।

* যেকোনো কারণবশত মেডিকেল সেবা নিতে না পারলে শান্ত থাকুন। প্যারামেডিকসকে শিগগির পাওয়ার আশা না থাকলে যতটা সম্ভব স্বাচ্ছন্দ্যে থাকুন ও বিষ ছেড়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করুন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাপ কামড়ে মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার মতো বিষ প্রয়োগ করে না। নিজস্ব সচেতনতা বজায় রাখুন। শান্ত থাকুন। নড়াচড়া একদমই করবেন না। সাপের কামড়ে ভীত ও উদ্বিগ্ন হলে মারাত্মক পরিণতির দিকে চলে যাবেন। মনে রাখবেন, হার্টের কম্পন বেড়ে গেলে শরীরে দ্রুত বিষ ছড়িয়ে পড়বে।

নির্বিষ সাপের কামড়ের চিকিৎসা
* রক্ত পড়া বন্ধ করুন। নির্বিষ সাপের কামড় জীবননাশের কারণ নয়। কিন্তু ইনফেকশন এড়াতে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে হবে। বিষহীন সাপের কামড়ের চিকিৎসা পাঙ্কচার ক্ষতের (যেমন- নখে খোঁচা লেগে সৃষ্ট ক্ষত) মতোই করুন। স্টেরাইল গেজ বা ব্যান্ডেজ সহযোগে ক্ষতস্থানে ভালোমতো চাপ প্রয়োগ করুন। এক্ষেত্রে আপনাকে বেশি রক্ত হারাতে হবে না। সাপ নির্বিষ কিনা নিশ্চিত না হয়ে এ পদ্ধতিতে চিকিৎসা করবেন না। যদি সন্দেহে ভুগেন তাহলে অবিলম্ব মেডিকেলের শরণাপন্ন হন।

* সতর্কতার সঙ্গে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করুন। পরিষ্কার পানি ও সাবান দিয়ে কয়েক মিনিট ধরে ধুতে থাকুন। ক্ষতস্থানে বেশি করে পানি ঢালুন। তারপর আবার ধুয়ে নিন। স্টেরাইল গেজ দিয়ে শুকিয়ে নিন। অ্যালকোহল মিশ্রিত প্যাড পাওয়া গেলে ব্যবহার করতে পারেন।

* অ্যান্টিবায়োটিক অয়েন্টমেন্ট ও ব্যান্ডেজ দিয়ে ক্ষতস্থানের চিকিৎসা করুন। পরিষ্কৃত ক্ষতস্থানে অ্যান্টিবায়োটিক অয়েন্টমেন্টের প্রলেপ দিয়ে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিন। এর ফলে ইনফেকশনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

* মেডিকেলের দ্বারস্থ হন। আপনার ডাক্তার নিশ্চিত হবে ক্ষতস্থান সঠিকভাবে পরিষ্কৃত ও যত্ন নেওয়া হয়েছে কিনা। ডাক্তার থেকে জেনে নিন আর কোনো মেডিকেল সেবা লাগবে কিনা কিংবা টিটেনাস শট নিতে হবে কিনা।

* ক্ষত সেরে উঠার সময় ক্ষতস্থান খেয়াল রাখুন। বিষহীন সাপের কামড়েও ইনফেকশন হতে পারে। ইনফেকশনের যেকোনো উপসর্গ (যেমন- লাল হয়ে যাওয়া, দাগ, ফোলা, পানি ঝরা ইত্যাদি) দেখা দেয় কিনা লক্ষ্য করুন। যেকোনো উপসর্গ দেখা দিলে বা জ্বর আসলে ডাক্তারের কাছে যান।

* আরোগ্য লাভের সময় প্রচুর পরিমাণে তরল পান করুন। সাপে কাটা ক্ষত থেকে সেরে উঠার জন্য সঠিক মাত্রায় হাইড্রেটেড থাকতে হবে। সাধারণত দিনে ২ লিটার পানি খাওয়ার নিয়ত করুন।

সাপ ও তাদের কামড় সম্পর্কে জ্ঞান
বিষধর সাপ সম্পর্কে জানুন। বেশিরভাগ সাপ বিষাক্ত নয়, কিন্তু সব সাপই কামড়াতে পারে। কোবরা, কপারহেড, কোরাল স্নেক, কটনমাউথ, র‍্যাটল স্নেক ইত্যাদি হল পরিচিত বিষাক্ত সাপ। অধিকাংশ বিষাক্ত সাপের মাথা ত্রিকোণাকৃতির। সত্যিকার অর্থে বিষাক্ত সাপ চিনতে মরা সাপের দাঁত ও লালাগ্রন্থি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

* সাপের দংশন সম্পর্কে জানুন। বিষহীন সাপে কামড়ালে চিন্তার বিষয় হল ইনফেকশন ও টিস্যু ফুলে যাওয়া। কিন্তু বিষাক্ত সাপে কামড়ালে এই দুটি সমস্যার সঙ্গে বিষের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টাও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বেশিরভাগ সাপ বিরক্ত না করলে কামড়ায় না। না কামড়ানো পর্যন্ত সাপের দন্ত ভাঁজ করা বা গুটানো থাকে। বিষাক্ত সাপের অন্যরকম দাঁতও আছে। কোরাল স্নেকের কামড়ে নার্ভাস সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। র‍্যাটল স্নেকের কামড় ব্লাড সেলে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। সকল রকম সাপে টিস্যু ধ্বংসের উপাদান রয়েছে। সাপে কামড়ালে টিস্যু ধ্বংসকে প্রতিরোধ করুন। তা না হলে পরে গুরুতর সমস্যায় পড়ে যাবেন।

* সাপের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানুন। সাপ শীতল রক্তের প্রাণী। তারা চারপাশ ও সূর্য থেকে উষ্ণতা গ্রহণ করে। শীতল আবহাওয়ায় বা শীতে তাদের উপদ্রব কম হয়ে থাকে। তারা শীতে সুপ্ত (হাইবারনেটিং) থাকে।

* যেখানে সাপ লুকিয়ে থাকতে পারে সেখানে ঘুমাবেন না কিংবা বিশ্রাম নেবেন না। ঝোঁপ, লম্বা ঘাস, বড় পাথর, গাছপালা এসব জায়গায় সাপ লুকিয়ে থাকতে পারে। পাথরের ফাঁক, যেকোনো গর্ত, ঘন ঝোঁপ বা সাপ থাকতে পারে এমন জায়গায় হাত দিবেন না। ঝোঁপ বা লম্বা ঘাসের ওপর হাঁটার সময় নজর নিচের দিকে রাখুন। জীবিত কিংবা মৃত কোনো সাপই ধরবেন না। জীবিত সাপের পাশাপাশি মৃত সাপ থেকেও দূরে থাকুন। রিফ্লেক্সিভ অ্যাকশনের কারণে সাপ মরে যাওয়ার ১ মিনিট বা বেশি সময় পরেও কামড়াতে পারে। অবিশ্বাস্য হলেও কিন্তু সত্যি।

Facebook Comments