সৌন্দর্যের লীলাভূমি মৌডুবীর জাহাজমারা

আপডেট : April, 26, 2017, 4:35 pm

বলছিলাম পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালি উপজেলার কথা। রাঙ্গাবালী উপজেলাটি পটুয়াখালী জেলার সর্বদক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের পাদদেশে অবস্থিত। উত্তরে চালিতাবুনিয়া ও আগুনমূখা নদী ও চর বিশ্বাস, পশ্চিমে রামনাবাদ চ্যানেল ও কলাপাড়া উপজেলা পূর্বে চর ফ্যাশন উপজেলার চর কুররী-মুকরী এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর।

কলাপাড়া উপজেলার পশ্চিমে রাঙ্গাবালি উপজেলার একটি দ্বীপ রয়েছে, যেটি মৌডুবির চর নামে পরিচিত। আর সেই দ্বীপেই কাটে আমার শৈশবের প্রায় তিনটি বছর। মৌডুবির চরটি শহরের কোলাহল আর যান্ত্রিক দূষণ থেকে একেবারে মুক্ত। পুরো মৌডুবীর চরটি ঘিরে একটি বেড়ীবাঁধ ছাড়া বলার মত কোনো কাচা সড়কও নেই এখানে।

আর পাকা সড়কের তো প্রশ্নই ওঠে না। বর্তমানে এখানের যান্ত্রিক যোগাযোগ মাধ্যম বলতে শুধু মোটরসাইকেলকেই বলা যায়। এ দ্বীপের প্রধান আয়ের উৎস মৎস্য শিকার ও চাষাবাদ। এছাড়াও এ উপজেলাটি একটি দ্বীপ হওয়ায় পুরো রাঙ্গাবালিতে নেই কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ।

ছোট বেলার বন্ধু রুমানের ডাকে সেখানে যাওয়ার হাতছানি খুঁজে পেলাম। গুগল ম্যাপে শৈশবের আনন্দের ভূমিতে খুব সহজে যেতে পারলেও বাস্তবে ওই স্থানে যাওয়াটা অনেক দুর্ভোগের ব্যাপার। পটুয়াখালী জেলার কলাপারা উপজেলা শহর থেকে প্রতিদিন দুপুর ১টায় ছেড়ে যায় একটি ‘একতলা’ লঞ্চ (ছোট লঞ্চ)। ওই লঞ্চে উঠে আগুনমূখা নদী পাড়ি দিতে হয় প্রায় চার ঘণ্টা সময় নিয়ে।

আগুনমূখা নদী পাড়ি দেয়ার সময় মনে পড়ে যায় ছোট বেলায় এই নদী পাড়ি দেয়ার সময়ের কথা। ঝড়ের দিনে এই নদী যে কত ভয়ানক হতে পারে তা আমি নিজ চোখে দেখেছি। সেই দিনের কথা মনে পড়লে আজও গা শিউড়ে উঠে। যা ভাষায় বোঝাতে পারবো না। তবে এটুকু বলতে পারি যাদের হার্ট দুর্বল তারা ঝড়ের দিনে এই নদী পাড় হলে আমি নিশ্চিত তিনি হার্ট অ্যাটাকের সান্নিধ্য পাবেন খুব সহজেই।

যাইহোক সেখানে যেতে যেতে রাত হয়ে গেল, শুরু হল বৃষ্টি। তাই রাতে আর কোথাও নামার সুযোগ হয়নি আমাদের। পর দিন চলে গেলাম সাগর পাড়ে মানে ‘মৌডুবীর জাহাজমারায়’। এ যেন এক অন্য স্পন্দন, অন্য জগৎ, অতৃপ্ত শান্তি। ১৪ বছর পর

গেলেও মনে হচ্ছে ঠিক দুইদিন আগেও এখানেই ছিলাম আমি। সারা দুনিয়ার পরির্বতন ঘটলেও এখানের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি।

সাগর পাড়ে সংরক্ষিত বনের মরে যাওয়া গাছের গোড়া, পানি কমে গিয়ে যেন সাগরের তৈরি করে দেয়া সীমাহীন খেলার মাঠ। বনের বৃক্ষের ফাঁক দিয়ে হেলে পড়া সূর্যের হাসি। বিকেলে সাগর পাড়ের বিশাল মাঠে মহিষের বিচরণ। শেষ বিকেল থেকে শুরু হওয়া লাল কাকড়ার ছুটোছুটি। এ যেন কোনো কিছুরই পরিবর্তন ঘটেনি এই দ্বীপে। সাগরতীরের প্রাকৃতিক দৃশ্য এক কথায় অসাধারণ। যে কারও চোখের নজর কাড়বেই।

অবশেষে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘোরাঘুরি শেষে চলে আসলাম বন্ধু রুমানের বাসায়। এভাবে আরও তিনদিন মধুর সময় কাটিয়ে ফের চলে আসলাম কোলাহল আর যান্ত্রিক দূষণের কর্মক্ষেত্রের শহরে।

রাঙ্গাবালী উপজেলার কিছু তথ্য: এখানের বড় সমস্যা হল যারা যাবেন তাদের থাকার জন্য কোনো প্রকার ব্যবস্থা নেই। তবে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হলে সোনার চর ও জাহাজমারাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রাঙ্গাবালী উপজেলার নামকরণের সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি। তবে কথিত আছে যে, সাগর বক্ষে নতুন বালুচর সৃষ্টির ফলে কালের বিবর্তনে এই বালুচরের বালু লাল ছিল। এই ‘লাল’ শব্দটি আঞ্চলিক ভাষায় রাঙ্গা নামে পরিচিত। এ থেকে রাঙ্গাবালি নামের উৎপত্তি। ১৭৮৪ সালে কতিপয় রাখাইন জনগোষ্ঠী আরাকান রাজ্য থেকে পালিয়ে এসে এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। তখন থেকে এতদঞ্চলে জনবসতি শুরু হয়।

রাঙ্গাবালী উপজেলার সর্বদক্ষিণে সোনারচর ও রুপারচর অবস্থিত। একই স্থানে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায় যা বিশ্বে বিরল। এ অঞ্চলের ম্যানগ্রোভ বন মৌ চাষীদের মধু আহরণের অভয়ারণ্য।

যেভাবে যাবেন: ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন বিকেল ৪টায় রাঙ্গাবালির লঞ্চ ছেড়ে যায়। রাঙ্গাবালি নেমে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল নিয়ে মাত্র দুই ঘণ্টায় যাওয়া যাবে জাহাজমারায়। এছাড়াও কুয়াকাটা থেকেও যাওয়া যাবে সেখানে। কুয়াকাটা থেকে বাসে করে কলাপাড়ায় আসবেন। এখান থেকে প্রতিদিন বেলা ১১টায় একটি ট্রালার ও দুপুর ১টায় একটি ছোট লঞ্চ ছেড়ে যায় মৌডুবির উদ্দেশ্য। -কালের কণ্ঠ

Facebook Comments