বরিশাল লাইভ

ঢাকা, মার্চ ২৭, ২০১৫

প্রকাশ : মার্চ ২৭, ২০১৫ , ৪:২৩ অপরাহ্ণ
মোবারক আমার বন্ধু

মো. শহীদুল আলম,জেলা প্রশাসক, বরিশালঃ

মোবারক আমার বন্ধু, আমার সহপাঠী। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত আমরা ছিলাম হরিহর আত্মা। সে আমাকে তুই বলে ডাকত। এখন সে শ্রমিক। এখন থেকে ৪৫ বছর আগেও সে বিড়ি টানত। ধূমপানে ছিল তার আনন্দ। ছাত্র হিসেবে খারাপ ছিলনা। দুস্টুমি এবং দৈহিক সামর্থে সে ছিল আমার চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু আজ সে ক্ষীণকায় কৃশ দেহ মোবারক। আমি পড়ালেখা ছাড়িনি। সে ছেড়েছে। আমি হাইস্কুলে গেছি, সে যায়নি। ফলে আমি দিনে দিনে এগিয়েছি আর মোবারক দিনে দিনে পিছিয়েছে। তার বুদ্ধি তথ্য ভরে ভরপুর হয়নি। তাই সে এখন আমাকে আপনি বলে ডাকে। আমি লজ্জা পাই, তবু তাকে বাধা দিতে বাধে। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন মোবারক এবং শত বন্ধুর স্মৃতি আমাকে আলোড়িত করত। অবসরে মোবারককে আমার খুবই মনে হত। বৃষ্টি হলেই মনে হত মোবারক বুঝি আমাকে ডেকে বলবে আলাউদ্দিন চল ভিজ্‌তে যাই। চল্‌ মাছ ধরতে যাই। হয়তো বলবে শিল পড়ছে চল শিল কুড়াই। কিন্তু মোবারক আসেনা। মোবারক আমার বন্ধু কিন্তু সে আমার সমাজিক সাথী না। তবু মোবারককে ভালোবাসি, সে আমার পাঠের সাথী, কিশোর সাথী। আমার বন্ধু।

 

ঈদে বাড়ী গেলাম। আমি অনেক বড়। লোকজনে দূর হতে সমিহ করে। কিন্তু মোবারক আসেনা। সেমাই-জর্দা রান্না হয়েছে মোবারক এলোনা। রাতে মোবারক কে খবর দিলাম। মোবারকের ছেলে মোশারেফ এলো। কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকল। বসতে বললাম। সে বসলনা। বললাম ‘বাবা কোথায় ?’ মোশারফ জবাব দিলনা। অনেক পরে বলল “বাবা অসুস্থ্য, হাটতে পারেনা।” বুকের মাঝে মোচড় দিয়ে উঠল। ডান হাতটা বাম বুকে উঠে গেল। নিঃশ্বাসে কষ্টবোধ হল। মোশারেফ আমার কেউনা, তবু তাকে জড়িয়ে ধরলাম। মোশারেফ বুঝতে পারলনা, কেন তাকে আমি ধরতে গেলাম। কেন আমার চোখ দুটো অশ্রুস্নাত। মোবারক আমার মত সুখী জীবন পেতে পারত। তার সন্তান এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারত। মোবারকের স্ত্রী সৌখিন-সৌম্য রমনী হতে পারত। কিন্তু মোবারকের কিছুই যেন পাওয়া হলনা। মোবারক শুধু অসুখ পেল। সুখ পাখি তার উড়ে গেছে দূরে, বহু দূরে। যৌবন পূর্ব সময়েই তার মানব জীবন ছিল। সম্মান ছিল। বড় হয়েই সে দেখেছে অভাব, কর্মহীনতা, অপমান। পিতা-মাতা হতে সে পৃথক অন্নে বাস করেছে বহুদিন। পিতা ও পিতা থাকেনি, আবার সন্তান হয়েও সে মায়ের কোলে থাকতে পারেনি। মাকে ভাত দিতে পারেনি। মায়ের শাড়ী দিতে পারেনি। শুধু বিয়ের মাধ্যমে পেয়েছে স্ত্রী এবং এক গুচ্ছ ছেলে-মেয়ে। তবু মোবারক আমার বন্ধু।

 

সকালে সহধর্মীনিসহ মোবারকের বাড়ীতে গেলাম। মোবারক হাসল। বসতে দিতে অস্থির হল। আমি শুধু অচঞ্চল চোখে তার চোখে চোখ রাখলাম। মোবারককে কিছু টাকা দিতে চাই। কিন্তু কেমন যেন লাগে। হাত ওঠেনা। বন্ধুকে দান করে বড়ত্ব দেখাতে গেলে কতটুকু কষ্ট বোধ হয় সেটা আজ বুঝলাম। তবু মোবারকের টাকাটা দরকার। চিকিৎসার জন্যই দরকার। খাম ভর্তি করাইছিল। বৌ এর সামনে দিতে সংকোচ হচ্ছিল মোবারকের সম্মানের কথা ভেবে। তাই ইশারা করাতেই আমার সহধর্মীনি উঠে গিয়ে গ্রামের আকাশ দেখতে থাকল। আমি মোবারকের হাতে একটা খাম গুজে দিতে চেষ্ট করলাম। মোবারক আলতো হাতে ধরে রাখলো খামটা। তার মুখ থেকে গরম নিঃশ্বাস বের হলো। একটু হাঁপানির মত মনে হল। আমি কি বলব ভেবে না পেয়ে বললাম, মোবারক আজ আসি। চিকিৎসা করানোর ব্যবস্থা করো। মোবারক নীরব হয়ে থাকল।

 

বাস্তব জীবনে যোগ দিতে আমি ফিরে এলাম ঢাকাতে। অনেক কাজ। অনেক ভনিতা নিয়ে জীবন। আধুনিক জীবন। আমার জীবন এখন বহু দামী। বন্ধু এসেছে। তারা দেখতে সুদর্শন। অনেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তবু মাঝে মাঝে আমার ঘুম ভেঙে গেলে আমি মোবারকের কথা ভাবি। গাড়ী জ্যামে আটকে গেলে ভাবি এখন আমিও একজন মোবারক। তেল পুড়ছে অথচ গাড়ী যাচ্ছেনা। যেমন মোবারক বেঁচে আছে অথচ হাটতে পারেনা। অস্থিরতা শুধু অস্থিরতা কাজ করে আমার মনে। ভাবি এ জীবনে যদি আর কোনদিন মোবারকের সংগে আমার দেখা না হয় তাহলে অসুস্থ্য বন্ধুর মুখ খানাই বুকের মধ্যে ছবি হয়ে থাকবে। আমি এটা চাইনে। একেবারেই চাইনে। আমি মোবারককে সুস্থ্য দেখতে চাই। মোবারক নারকেল

গাছে উঠে ডাব পেড়ে এনে বলবে আলাউদ্দিন ধর। আমি সেই ডাবের পানি খাবো। আর বুক ভিজে উঠবে বিশৃঙ্খল ডাবের জলে। তারপর মোবারক বলবে ঠিকমত খেতেও পারিস্‌নে। আমি সে রকম একটা নির্জন দুপুরের সন্ধানে হাঁসফাস করতে থাকি। তারপর ভিতরে ভিতরে টাকা গোছাই। তিন দিনের ছুটি নিয়ে বাড়ীতে যাই। হাতে অনেকগুলো টাকা। গভীর রাতে পৌঁছেছি বলে আর মোবারকের কাছে যেতে পারিনি। আধো ঘুমে আমার ক্লান্ত রাত কেটে যায়। ভোর বেলা উঠেই চলে যাই মোবারকের বাড়ী। মা বলেন, আরো একটু ঘুমো। এত কাজে থাকিস ! বাড়ীতে একটু শান্তিমত ঘুমিয়ে নে। কিন্তু আমার ঘুম আসেনা। মায়ের কথায় কোমল একটা শান্তি লাগে। তবু উঠে পড়ি। মোবারকের বাড়ী গিয়ে তারপাশে বসি। মোবারক তাতে কেমন যেন সংকোচবোধ করে। আমি তাকে বলি বন্ধু শুধু তোমার জন্যই এসেছি। চলো উঠে পেয়ারা পেড়ে খাই। চলো নারকেল গাছের নীচে গিয়ে বসি। কথায় কি যাদু ছিল জানিনা। মোবারক সত্যি উঠে বসল। তারপর আমাকে ধরে দাড়াল। বললো চল্‌ যাই। সত্যি সত্যি মোবারক হাটা শুরু করলো। তার ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রী হা হয়ে দেখতে থাকলো। কি অবাক কান্ড যে মানুষ ১২ বছরে হাটেনি সে কিভাবে হেটে গাছ তলায় এলো ! আমিও বিস্মিত। মোবারকের মুখে সুন্দর একটা হাসি। তারপর দুই বন্ধু চলে গেলাম শিশু স্মৃতিতে। মোবারকই বেশি বলছে। আমি শ্রোতা মাত্র। আস্তে আস্তে মোবারক হেটে তার স্ত্রীর কাছে এলো। ছেলে মোশারফের কাছে গেল। ছোট মেয়ের কাছে গেলো। কেমন জানি অস্বস্থি বোধ করতে লাগলাম। তারপর মোবারক আমার হাত ধরে তার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো। আমার সংগে তার আর কোন কথা হলো না। অনেকক্ষণ বসে থেকে উঠে এলাম বাড়ীতে। কিন্তু কিছুতে মোবারকের অস্থির মুখখানা ভুলতে পারছিলাম না। তাই উঠে স্নান ও নাস্তা শেষ করে ভাবতে থাকলাম বিষয়টির কিভাবে ব্যাখ্যা হতে পারে ? মোবারক কি সুস্থ্য হয়ে উঠছে না কি তার জীবন প্রদীপ নিভে যেতে চাইছে ? মনটা ভাল লাগলো না। আমি বসে থাকলেও মন বসে নেই। মন উড়ে বেড়াচ্ছে স্মৃতির সকল পাতা জুড়ে। একটু পরে মোশারফ এলো। হাতে একটা চিঠি। ভাঙা ভাঙা লেখা নয়। একেবারে ঝকঝকে লেখা, মোবারকের লেখা। আমি নড়াচাড়া করলাম। পড়লাম। টাকার জন্য সে ধন্যবাদ দিয়েছে। তবে শেষ লাইন পড়ে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। মোবারক লিখেছে, তুমি আমাকে সুস্থ্য দেখতে চেয়েছিলে, আমি সুস্থ্য হয়ে তোমাকে দেখিয়েছি। তোমার ভালবাসা, তোমার বন্ধু প্রেম আমাকে সম্পূর্ণ সুস্থ্য করে দিয়েছে। তাই আমি অসুস্থ শরীর আর কাউকে দেখাতে চাইনে। আমি সুস্থ্য হয়েই চলে যেতে চাই। তোমাকে ডাব পেড়ে খাওয়াতে পারলাম না। শুধু চোখের জলে তোমার বুকের গেঞ্জিটা ভিজিয়ে দিলাম। কষ্টে রেখোনা। আমার মত বন্ধু ভাগ্য কজনের হয় ? তুমি আলাউদ্দিন, আমি মোবারক। এর চেয়ে বড় কি আর আছে। কত বড় তুমি তবু আমারে হাত ধরে তুললে। তুমি ঢাকার জ্যামে পড়ে যা ভাবো আমি তা টের পাই। তোমার জীবনের জ্যামের সংগে আমার জ্যামের কোন মিল নেই। তোমার জন্য ট্রাফিক আছে । কিন্তু আমার জ্যাম আর ছাড়াবে না। ভাল থেকো। নিজ হাতে একটু মাটি দিয়ে যেও।

 

আমি তৎক্ষণাৎ ছুটে যেতে চাইলাম। কিন্তু মা একটু থামাল। তারপর দম নিয়ে ধীরে ধীরে মোবারকের বাড়ীর কাছে যেতে মৃত্যুসুরের কান্না শুনতে পেলাম। আমি কতক্ষণ হেটেছি তার আর মনে পড়েনা। মনে হয়েছিল যেন আমি বহু যুগ দাড়িয়ে আছি। অনেকে এলো। মোবারককে গোসল করানো হলো। আমি হাতে মাটি নিয়ে তার কবরের উপরে নরম হাতে ছাড়িয়ে দিলাম আর মাটিরসংগে মিশিয়ে দিলাম শিশিরের মত অশ্রু বিন্দু।

 

মোবারক আমার বন্ধু। সে অনেক কিছু পড়েনি। তবে সে পড়েছে আমার মনের কথা। পড়েছে আমার হৃদস্পন্দন। ইতোমধ্যে গেছে কয়েক বছর ।হয়তো বেঁচে থাকবো আর কিছুকাল। আর খুজতে থাকবো মোবারককে। আমার বন্ধু, প্রিয় বন্ধু মোবারককে। যে পড়তে পারতো দূর হতে মনের কথা। মনের আকুতি।

Capture

মো. শহীদুল আলম,জেলা প্রশাসক, বরিশাল

 

 

 

আপনার মন্তব্য

সর্বশেষ খবর