বরিশাল লাইভ

ঢাকা, জানুয়ারি ১২, ২০১৭

প্রকাশ : জানুয়ারি ১২, ২০১৭ , ১:১০ পূর্বাহ্ণ
মুগ্ধতার আপর নাম সাগর কন্যা কুয়াকাটা…

 

ফারুখ আহমেদ: চর গঙ্গামতি। ঝাউ পাতায় ভোরের শিশির বিন্দু । সে বিন্দু ছড়িয়েছে ছোট্ট খেজুর গাছের পাতায়। আমাদের অবশ্য বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই। আমরা তাকিয়ে আছি পূর্ব দিগন্তের অসীম সৌন্দর্য ভরা সমুদ্র জলরাশির দিকে। সে জল ভেদ করে এক সময় ধীরে ধীরে লাল থালার মত সূর্য আমাদের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে হাসল। আমরা খুশিতে লাফিয়ে উঠলাম! আগের দিনই কুয়াকাটা এসেছি কেবল সমুদ্র সৈকত থেকে এমন সূর্যোদয় দেখবো বলে। আমাদের স্বপ্নপূরণহলো! আমাদের ডেরা থেকে প্রায় একঘন্টার দূরত্বের  চর গঙ্গামতি এসেছি ফজরের আযানের সঙ্গে সঙ্গে। আগের দিন মোটর সাইকেলের শামিমকে বলে রেখেছিলাম। শামিম আমাদের ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে ডেকে নিয়ে এসেছে। না হলে এই শীতে আমাদের এখানে আসাই হতো না, দেখা হতো না সূর্যোদয়!.

কুয়াকাটা ১
কুয়াকাটা এই উপমহাদেশের একমাত্র সমুদ্র সৈকত যেখান থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়। এক সময় পথের দুর্বোদ্ধতার জন্য যাই যাই করে অনেকেই যেতে পারছিলেন না, একটা আফসোস তো রয়ে গেছিলো অনেকেরই। কিন্তু এখন সে অসুবিধা নেই। রাস্তা ভালো, আগের মতো ফেরির ঝামেলা নেই। পরিকল্পনা করে একদিন চলে গেলেই হয়। সামনে দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্র। নির্জন এই সমুদ্র সৈকতে প্রকৃতির কলতানে হারিয়ে যেতে কোনও বাঁধা নেই। জীবনের জন্য এ হবে অন্য রকম এক অভিজ্ঞতা।কুয়াকাটা ২আবার অনেক সময় পরিকল্পনা করেও কিছু হয় না, যেমন এই শীতের একদিন হুট করে আমরা মধুমতি স্টিমারের যাত্রী হলাম। পটুয়াখালীর লঞ্চের টিকিট না পেয়ে সাপেবর হলো। টিকিট পেলাম মধুমতির, তবে বরিশাল পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার পাঁচটায় সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে উপস্থিত হলাম।

মধুমতি স্টিমার ছাড়লো সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায়। ততক্ষণে ঢাকা শহর অন্ধকারে তলিয়েছে। শীত আরও তীব্ররূপ ধারন করেছে। আমরা লেপের নিচে আশ্রয় নিলাম। স্টিমার ভোর চারটায় বরিশাল পৌঁছলেও আমরা নামলাম ভোর ছয়টায়। তারপর কনকনে শীতে কাঁপতে কাঁপতে চলে এলাম বিআরটিসি বাস টারমিনাল। শুনেছিলাম এখান থেকে প্রতি একঘন্টা পরপর বাস ছেড়ে যায় কুয়াকাটার উদ্দেশ্যে। কিন্তু বাস টার্মিনাল এসে জানলাম ১০টার আগে কোনও বাস নেই। কী আর করা! চলে এলাম রুপাতলি। এখানে বাস কুয়াকাটা যাত্রার জন্য তৈরি হয়েই ছিল। টিকেট কেটে বাসে চড়ে বসলাম, অল্প কিছুক্ষণ পরই বাস ছাড়লো। তারপর চারপাশের প্রকৃতি আর সঙ্গীর সঙ্গে খুনসুটি করতে করতে পথচলা। রাস্তার পাশের মরা খালে নীল শাপলার ছড়াছড়ি। চোখ জুড়িয়ে যাওয়া বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত দেখতে দেখতে ঠিক চারঘন্টা পর দুপুর ১২টায় আমরা কুয়াকাটা পৌঁছলাম।

কুয়াকাটা ৩কুয়াকাটায় বাঙালি ও রাখাইন সম্প্রদায়ের বসবাস। আরকান বা বার্মা রাজ্য থেকে রাখাইন সম্প্রদায়ের আগমন সেই আঠারশ শতকে। পটুয়াখালির রাখাইন উপজাতি শীর্ষক গ্রন্থ থেকে জানা যায়, রক্ষা শব্দ থেকে রাখাইন শব্দের উৎপত্তি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর রাখাইন আদিবাসি বাংলাদেশে বসবাসের আগে আরাকান রাজ্যে বসবাস করতেন। খৃষ্টপূর্ব ৩৩২৫ থেকে ১৭৮৪খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত আরাকান স্বাধীন রাজ্য ছিল। আঠারশ শতকে আরাকান রাজা মহাথামাদা বর্মী রাজ বোঁধপায়ার কাছে পরাজিত হলে বর্মীরা আরাকান দখল করে। বর্মী অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য ১৫০টি রাখাইন পরিবার ৫০টি নৌকা যোগে আরাকান ত্যাগ করে পশ্চিমে যাত্রা শুরু করে। এভাবেই তারা গলাচিপা উপজেলার রাঙ্গাবালী দ্বীপে পৌঁছায় এবং প্রায় ৪৮ বছর পর কুয়াকাটা উপকূল আবিষ্কার করে এবং এখানে বসবাস শুরু করে। তখন এর নাম হয় ক্যাংছাই। যার অর্থ দাঁড়ায় ভাগ্যকূল। তাছাড়া প্রচলিত আছে যে, এখানে সমুদ্র উপকূলে মিষ্টি পানির সন্ধান পাওয়া গেলেও দূর্ভোগ ছিল ভীষণ। এখানে কুয়া কাটা হত ঠিকই, কিন্তু বালি দিয়ে তৈরি বাঁধ ভেঙ্গে যেত। তাই রাখাইনরা নিজেদের দূষতো ভাগ্য বঞ্চিত হিসাবে। রাখাইন ভাষায় যার অর্থ দাঁড়ায় ক্যাওয়েছাই। এভাবেই কুয়া কাটতে কাটতে এই উপকূল অঞ্চলের নাম হয়ে ওঠে ক্যাছাইও, যার বাংলা অর্থ কুয়াকাটা। শেষে এক সময় এলাকার নাম কুয়াকাটা হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। আমরা কুয়াকাটায় শিবলী আহমেদের সিন্ড্রেলা রিসোর্টে আমাদের ডেরা গাড়লাম।

কুয়াকাটা ৪ সমুদ্র থেকে একেবারে কাছে আমাদের রিসোর্ট সিন্ড্রেলা। রাস্তায় দাঁড়ালে দু’চোখে পরে সারি সারি নারকেল গাছ। মূল সৈকত থেকে একটু দূরে বিধায় বেশ নির্জন এই বালুকাবেলা। এখানে সমুদ্র বেশ উপভোগ্য, মাছ ধরার নৌকা আর জাল টানার দৃশ্য চোখে পড়লো। সব মিলিয়ে

যেন ক্যানভাসে আঁকা ঝকঝকে ছবি। এখানে চলাচলের প্রধান বাহন ভ্যান গাড়ি আর মোটর সাইকেল। রিকশাও আছে তবে সবাই মোটর সাইকেলের উপরই নির্ভরশীল।

কুয়াকাটা ৫
আমরা সেদিন বিকেলে বের হই। হেঁটে চলি সমুদ্র সৈকত অভিমুখে। নীল আকাশে সাদা মেঘ আর নারিকেল গাছের সবুজ হাতছানি সত্যি মনোরম। শীতকাল বলেই পর্যটকদের ভিড় আছে। তবে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের মতো নয়। সৈকত পারে সারি সারি কাঠের বিছানা আর ছাতা চোখে পড়লো। আমরা একটা ছাতা ভাড়া নিয়ে তার নিচে আশ্রয় নিলাম। সে শুধু অল্প সময়ের জন্য। এরপর আমরা চলে যাই শামিমের বাইকে চেপে লেবু বাগানের দিকে। সেখান থেকে আরও দূরের হাতছানিতে চলে আসি আন্ধারমানিকের নিরালায়। এখানে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে ফাতরার বন। মাঝখানে আন্ধারমানিক নদীর অপূর্ব প্রাকৃতিক সীমারেখা। এমন অপূর্ব পরিবেশে মন হারাতে বাধ্য। সূর্যালোক কমে আসতেই ফিরে চলি কুয়াকাটার দিকে। ফিরতি পথের অভিজ্ঞতা ছিল তাজা সামুদ্রিক মাছ ও কাঁকড়া ভুনার আপ্যায়ন। তারপর সেই অপরূপ মূহুর্ত। ধীরে ধীরে থালার মত হলুদাভ সূর্যটি সমুদ্রের কোলে আশ্রয় নিলো!বৌদ্ধ বিহার সিন্ড্রেলায় রাতের খাবার ছিল দারুণ। কোরাল মাছ, ডিমভর্তা ভাজি মিলে যেন একবারে নিজের ঘরের রান্না। সে রাতে আমরা অনেকক্ষণ গল্প করে কাটাই। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। ঘুম ভাঙে বাইক ড্রাইভার শামিমের মোবাইলে। বেশি রাতে ঘুমানোর জন্য শামীমকে সেদিনের মতো না করে বলে দেই আজ আর সূর্যাস্ত দেখতে যাব না। সকাল আটটায় আসতে বলি শামিমকে। আজ তাকে নিয়ে পুরো কুয়াকাটা ঘুরে দেখবো। শামিম ঠিক ঠিক সকাল আটটায় উপস্থিত। দিনটি যেহেতু ঘুরে বেড়ানোর তাই সকালের নাস্তা সেরে সামনের শুটকি পল্লী ঘুরে দেখি, তারপর চলে যাই মিশ্রীপাড়া।

শুঁটকি পল্লী

কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে মিশ্রীপাড়ার দূরত্ব ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার। মিশ্রীপাড়া রাখাইন পল্লী হিসেবেই পরিচিত। সীমাবৌদ্ধ বিহারের অবস্থান এখানেই। বিশাল বৌদ্ধ মন্দিরটি দেখে মুগ্ধ হতেই হবে। অনেকের মতে এটি দেশের সবচাইতে বড় বৌদ্ধ মন্দির। বৌদ্ধ মন্দিরটির পাশেই রয়েছে একটি কুয়া। বৌদ্ধ মন্দির আর কুয়া দেখা শেষে ফিরে আসি আবার কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে। ঝিনুক শামুকের মার্কেট ঘুরে বেড়াই। আবার গিয়ে বসি সমুদ্র সৈকতের পাশে। কতক্ষণ বসে ছিলাম জানি না।

কুয়াকাটা ৬ এবার কেনাকাটায় ব্যস্ত হই। তারপর হেঁটে চলে যাই শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহার। এখানে আমরা মন্দিরের ভেতর প্রবেশ না করে পাশের রহস্যময় নৌকার কাছে চলে আসি। একটি বেষ্টনির মত করে নৌকাটি রাখা। শতবছরের পুরাতন নৌকাটি নিয়ে অনেক গল্প চালু এখানে, সেসব গল্পে নাইবা গেলাম। তারপর চলে আসি শুঁটকি পল্লি, এখান থেকে আমাদের প্রয়োজনীয় শুঁটকি কিনে আমাদের ডেরায়। আমরা কুয়াকাটার সৈকতে সে রাত গল্প করে কাটাই। দিনের সৈকতের চাইতে রাতের সৈকত অনেক বেশি প্রাণবন্ত। এখানে সমুদ্রের ভয়ংকর রূপ রাতেই বোঝা যায় তার গর্জনে-তর্জনে। আমরা সেদিন সে গর্জন কানে নিয়ে রুমে ফিরে আসি ভোরের শিশিরের সাথে সূর্যোদয় দেখার আশায়!

বিশালাকার নৌকা শেষ কথা

চড় গঙ্গামতির ঝাউবনে সূর্যোদয় দেখার দৃশ্য আমাদের জীবনভর মনে থাকবে যেমন মনে থাকবে পুরো সৈকত জুড়ে হাজার হাজার লাল কাঁকড়া দেখা! এক সময় ঝামেলার জন্য অনেকে কুয়াকাটা যেতে ভয় পেতেন। এখন সেই সমস্যা নেই। পটুয়াখালীর লঞ্চে উঠলেই কুয়াকাটা চলে যাওয়া যায়। আর একবার যাওয়া হলে আজীবন কুয়াকাটায় ডুবে থাকা যাবে। সে গল্পে গল্পে জীবন পার!

কুয়াকাটা ৭কুয়াকাটার পথ

সদরঘাট থেকে লঞ্চে সরাসরি পটুয়াখালী হয়ে বাসে চেপে কুয়াকাটা সহজ পথ। আবার গাবতলি বাস ষ্ট্যান্ড  থেকে বিআরটিসির বাসেও যাওয়া যায়। তাছাড়া অন্যান্য বাস তো রয়েছেই, তবে বাসের চাইতে লঞ্চই আরামদায়ক। যেভাবেই যান জেনে রাখুন বাসে গেলে এখন বরিশাল থেকে কেবল একটা ফেরিই পার হতে হবে। এছাড়া এ পথে খানাখন্দ বা ফেরির কোনও ভয় নেই। খুব স্বচ্ছন্দেই চলে যাবেন কুয়াকাটা। এখানে থাকার জন্য আছে পর্যটন মোটেলসহ পর্যাপ্ত আবাসিক হোটেল। চাইলে শিবলী ভাই এর সিন্ড্রেলা রিসোর্টে থাকতে পারবেন। যেখানেই থাকুন না কেন, আগে থেকে বুকিং দিয়ে যাবেন। খাবার রেষ্টুরেন্ট তেমন ভালো না হলেও আপনাকে এখানে চড়া মূল্যে খাওয়া দাওয়া সারতে হবে। আমরা এ যাত্রায় ফাতরার বন যাইনি, আপনি কিন্তু সে ভুল করবেন না। কুয়াকাটায় কেনাকাটা করে সময় নষ্ট করবেন না। তবে শুঁটকি পল্লী থেকে অবশ্যই শুঁটকি নিয়ে আসবেন!

ছবি: লেখক 

আপনার মন্তব্য

সর্বশেষ খবর