সাধারণ জেলেপল্লি থেকে পাতায়া যেভাবে ‘যৌনতার রাজধানী’

আপডেট : March, 15, 2017, 12:37 am

সম্প্রতি ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য সান ও দ্য ডেইলি মিরর-এর নিবন্ধে থাইল্যান্ডের পাতায়াকে ‘বিশ্বের যৌনতার রাজধানী’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সাধারণ একটি জেলেপল্লি থেকে পাতায়া কীভাবে বিশ্রাম ও বিনোদন এবং ‘বিশ্বের যৌনতার রাজধানী’ হয়ে উঠল, তা নিয়ে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকক পোস্টেও একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

নিবন্ধটিতে জানানো হয়েছে, একসময় পাতায়া নামের জায়গাটি ছিল থাইল্যান্ড উপসাগরের একটি জেলেপল্লি। সাগরে অল্প কয়েকটি নৌকা এবং তীরে গ্রামবাসীর থাকার জন্য কিছু কুঁড়েঘর বাদে সেখানে আর কিছুই ছিল না।

১৯৫৯ সালের ২৯ জুন নাখন রাচাসিমার সামরিক ঘাঁটিতে থাকা ৫০০ সদস্যের একটি মার্কিন সেনাদল এক সপ্তাহের বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য পাতায়ায় যায়। ওই সেনারা সৈকতের দক্ষিণাঞ্চলের প্রান্তে স্থানীয় লোকদের কাছ থেকে কয়েকটি বাড়ি ভাড়া নেয়। তখন থেকেই ঘুমন্ত জেলেপল্লির জন্য প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যায়। মার্কিন সেনাদের মধ্যে পাতায়ার সৌন্দর্যের খবর ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি কংক্রিটের নগর ব্যাংককের পরিবর্তে জনপ্রিয় গন্তব্যে পরিণত হয়। ভূতাত্ত্বিক তথ্যব্যবস্থায় (জিআইএস) বিনোদনের জন্য সেরা সৈকত হিসেবে মানচিত্রে স্থান পায় পাতায়া।

বর্তমান ইউ-তাপাও বিমানবন্দর নামে পরিচিত পাতায়ার পাশের বান সাত্তাহি বিমানঘাঁটিতে যখন বিপুল পরিমাণে সেনারা আসতে শুরু করে, তখন থেকেই বাড়তে থাকে পাতায়ার জাঁকজমক। এর প্রায় অর্ধশতাব্দী পর ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া সেনা থেকে শুরু করে যৌন পর্যটক এবং থাইল্যান্ডের রেড লাইট অঞ্চলের বাসিন্দাদের গন্তব্যে পরিণত হয় পাতায়া।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলাকালে থাইল্যান্ডে বিশ্রাম ও বিনোদনের সুবিধা সৃষ্টি করতে থাইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৬৪ সালে পাতায়া সৈকতের অদূরে প্রথম মার্কিন ঘাঁটি ইউ-তাপাওয়ে পৌঁছায় জিআইএস। তখন থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর প্রায় সাত লাখ আন্তর্জাতিক সেনাকে এক সপ্তাহের বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়।

থাইল্যান্ডের সমাজে জীবিকার জন্য দেহ ব্যবসা নতুন কিছু নয়। ১৬৮০ সালে আয়ুথাইয়া যুগ থেকেই সেখানে পতিতাবৃত্তি বৈধ। এমনকি সেখানে সরকার পরিচালিত

যৌনপল্লি ছিল। তবে এই দেহ ব্যবসা কেবল ব্যাংকক অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে যখন থেকে আন্তর্জাতিক সেনারা আসতে শুরু করেন, তখন থেকেই যৌনকর্মীদের নতুন গন্তব্যে পরিণত হয় পাতায়া। যুদ্ধে যাওয়ার সপ্তাহ খানেক আগে বিনোদনের জন্য ছুটে আসা তরুণ সেনাদের মনোরঞ্জন করতে থাকেন যৌনকর্মীরা।

১৯৭৫ সালে উত্তর ভিয়েতনামিরা যখন যুদ্ধে জিতে যায়, তখন পাতায়াতে সাময়িক মন্দাভাব চলে আসে। সব সেনা সেখান থেকে চলে যায়। অনেক বার ও ক্লাব বন্ধ হয়ে যায়। অনেক যৌনকর্মী আগাম অবসরে যেতে বাধ্য হন। তবে ধীরে ধীরে কাছের এবং দূরের দর্শনার্থীদের স্রোত আসা শুরু হলে আবার উজ্জীবিত হয় থাইল্যান্ড। ১৯৭৮ সালে পাতায়া শহরের নামকরণ করা হয়। বৃহত্তর পরিসরে শহরটিতে পর্যটকদের জন্য বাজার তৈরি হতে থাকে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর অনেক সেনা কর্মকর্তা পাতায়াতেই থেকে যান। তারা থাই নারীদের বিয়ে করেন এবং বার ও রেস্টুরেন্টের ব্যবসা চালু করেন। আজকের দিনেও প্রতিবছর কয়েক লাখ সেনা কর্মকর্তা কোবরা গোল্ড নামে পরিচিত থাই-মার্কিন সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে পাতায়া আসেন।

নিঃসঙ্গ বয়স্ক মার্কিন নাগরিক ম্যাট।পশ্চিমা নারী বিয়ে করার প্রচেষ্টা  তিন দফায় ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি শ্বেতাঙ্গ মেয়ে খোঁজা বন্ধ করে দেন। এরপর তিনি এশীয় মেয়ে খোঁজা শুরু করেন। ম্যাট বুঝতে পারেন, তার স্বপ্নপূরণের জন্য পাতায়াই একমাত্র জায়গা।

 

১০ বছর আগে পাতায়ায় আসা ম্যাট বলেন, এখানে প্রতিদিনই ভালোবাসা পাওয়া যায়। আমি সাধারণত বছরে তিন মাসের জন্য এখানে আসি। আমি আমার কেনা সস্তা অ্যাপার্টমেন্টে থাকি। আমি আমার ভালোবাসার নীড়ে কতজনকে এনেছি, তা আপনাকে বলতে পারব না।

ম্যাট বলেন, ভালো লোকেরা স্বর্গে যায়, আর খারাপ লোকেরা পাতায়ায়।

অন্যদিকে দ্য সান ও দ্য ডেইলি মিরর-এর নিবন্ধে পাতায়াকে ‘বিশ্বের যৌনতার রাজধানী’ বলে বর্ণনা করায় থাইল্যান্ডের সরকারি কর্মকর্তারা, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুথ খুবই ক্ষিপ্ত। তিনি পাতায়ায় পতিতাবৃত্তি ও অবৈধ ব্যবসা বন্ধের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। এসব কর্মকাণ্ড থাইল্যান্ডের জন্য বিব্রতকর বলে মনে করছেন তিনি।

Facebook Comments