নিবন্ধিত না হলেও ভোটে লড়বে জামায়াত

আপডেট : July, 18, 2017, 3:55 pm

ডেস্ক রিপোর্টঃ আদালতের রায়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন বাতিল হয়েছে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের। দলীয় প্রতীকও হারিয়েছে আদালতের নির্দেশে। নিবন্ধন ফিরে না পেলে আগামী সংসদ নির্বাচনে দলগতভাবে একক প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না জামায়াতের প্রার্থীরা। মুক্তিযুদ্ধকালে শত্রুবাহিনীর সহযোগী হয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ করার জন্য বিচারে দলের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি হয়ে যাওয়াসহ আরও অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দলটি নির্বাচনে লড়তে চাইছে।

রাষ্ট্রের সংবিধানে মৌলিক স্তম্ভ গণতন্ত্রের সঙ্গে দলের ঘোষণাপত্র সাংঘর্ষিক হওয়ায় একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের আগস্টে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়।

বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ থেকে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বর্জন করলেও আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি।

দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদুল ফিতরের সময় নেতারা নিজ নিজ এলাকায় গণসংযোগ করেন। যারা যেতে পারেননি তাদের তরফে ঈদ উপহার বিতরণ করা হয়। গত সংসদ নির্বাচনে ৪৩ আসনে দলের প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি ছিল। আগামী সংসদ নির্বাচনে ৬০ আসনে ভোটে লড়ার প্রস্তুতি শুরু করা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কয়টি আসনে জামায়াতের প্রার্থী থাকবে তা নির্ভর করছে নিবন্ধন ফিরে পাওয়া এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে সমঝোতার ওপর।

নিবন্ধন না পেলেও সাম্প্রতিক পৌর ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মতো স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জামায়াত নেতারা দাঁড়াবেন। তারা বিএনপি বা অন্য দলের প্রতীকে প্রার্থী হবেন না। শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে এমন ৪০টি আসনে কাউকে ছাড় না দিয়ে নিজেরা ভিন্ন ভিন্ন প্রতীক নিয়ে লড়বেন বলেই দলের সিদ্ধান্ত আছে।

২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে জামায়াত লড়েছিল ৩৯টি আসনে। এর মধ্যে ৩৫টিতে বিএনপির প্রার্থী ছিল। বাকি চারটিতে দুই দলেরই প্রার্থী ছিল। জামায়াত জিতেছিল মাত্র দুটি আসনে।

২০০১ সালের নির্বাচনে ১৭টি, ১৯৯৬-এ তিনটি, ১৯৯১-এ ১৮টি এবং ১৯৮৬-তে ১০টি আসন পেয়েছিল জামায়াত। দেখা যায়, বিএনপির সঙ্গী হলে আসন বেড়েছে। ২০০১ সালে জয়ী হওয়া ১৭টি আসনের ১৬টিই হারিয়েছে ২০০৮ সালে।

গত মাসে রমজানে বিএনপির ইফতারে অংশ নেওয়া জামায়াতের একজন নায়েবে আমির এই প্রতিবেদককে জানান, ৬০ আসনে লড়ার মতো সক্ষমতা রয়েছে তাদের। তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন; শরিকদের সঙ্গে আসন নিয়ে আলোচনা হবে নির্বাচনের আগে। কেমন পরিবেশে, কেমন নির্বাচন হবে তার ওপর নির্ভর করবে অনেক কিছু।

সম্ভাব্য আসন ও প্রার্থী: দলীয় সূত্র থেকে পাওয়া এখন পর্যন্ত জামায়াতের যে প্রার্থীরা যেসব আসনে নিশ্চিত লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তার তালিকা নিম্নরূপ- এমএ হাকিম (ঠাকুরগাঁও-২), মোহাম্মদ হানিফ (দিনাজপুর-১), আনোয়ারুল ইসলাম (দিনাজপুর-৬), মনিরুজ্জামান মন্টু (নীলফামারী-২), আজিজুল ইসলাম (নীলফামারী-৩), হাবিবুর রহমান (লালমনিরহাট-১০), শাহ হাফিজুর রহমান (রংপুর-৫), নূর আলম মুকুল (কুড়িগ্রাম-৪), নজরুল ইসলাম (গাইবান্ধা-৩), আবদুর রহিম সরকার (গাইবান্ধা-৪), নুরুল ইসলাম বুলবুল (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২), মো. লতিফুর রহমান (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩), আতাউর রহমান (রাজশাহী-৩), রফিকুল ইসলাম খান (সিরাজগঞ্জ-৪), আলী আলম (সিরাজগঞ্জ-৫), মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান (চুয়াডাঙ্গা-২), মতিয়ার রহমান (ঝিনাইদহ-৩), আজিজুর রহমান (যশোর-১), আবু সাইদ মুহাম্মদ সাদাত হোসাইন (যশোর-২), অ্যাডভোকেট আব্দুল ওয়াদুদ (বাগেরহাট-৩), শহীদুল ইসলাম (বাগেরহাট-৪), মিয়া

গোলাম পারওয়ার (খুলনা-৫), শাহ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুছ (খুলনা-৬), ইজ্জতউল্লাহ (সাতক্ষীরা-১), মুফতি রবিউল বাশার (সাতক্ষীরা-৩), গাজী নজরুল ইসলাম (সাতক্ষীরা-৪), শফিকুল ইসলাম মাসুদ (পটুয়াখালী-২), অধ্যাপক জসিমউদ্দিন (ময়মনসিংহ-৬), ফরীদউদ্দিন (সিলেট-৫), মাওলানা হাবিবুর রহমান (সিলেট-৬), ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের (কুমিল্লা-১১), শামসুল ইসলাম (চট্টগ্রাম-১৪), হামিদুর রহমান আযাদ (কক্সবাজার-২) এবং শাহজালাল চৌধুরী (কক্সবাজার-৪)।

এ ৩৪টির মধ্যে ৬টিতে তথা চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২, সিরাজগঞ্জ-৫, ময়মনসিংহ-৬, সাতক্ষীরা-১, পটুয়াখালী-২, কক্সবাজার-৪ আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী ছিল না। ময়মনসিংহ-৬ আসনে ২০০১ সালে জামায়াত প্রার্থী জোটের মনোনয়ন পেয়েও পরাজিত হন।

প্রার্থীর নাম এখনই না জানা গেলেও পঞ্চগড়-২, রাজশাহী-২, রাজশাহী-৫, বগুড়া-২ ও চট্টগ্রাম-৭ আসনে জামায়াত লড়বে বলে ঠিক করেছে। কারণ, সর্বশেষ ২০১৪-এর উপজেলা নির্বাচনে এসব এলাকায় জয়ী হয়েছেন জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা।

দণ্ডিত নেতাদের আসন: ২০০৮ সালে জয়ী জামায়াতের সাবেক যে সংসদ সদস্যরা যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত ও বিচারাধীন তাদের আসনগুলোতে প্রার্থী বদল স্বাভাবিক কিন্তু প্রার্থী পাওয়া দুষ্কর বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়। তাদের মধ্যে ফাঁসি হয়েছে দলের আমির মতিউর রহমান নিজামী (পাবনা-১), মুহাম্মদ কামারুজ্জামান (শেরপুর-১) ও দলের মহাসচিব আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের (ফরিদপুর-৩); আমৃত্যু কারাদণ্ড ভোগ করছেন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (পিরোজপুর-১); আবদুস সুবহান (পাবনা-৫) ও এটিএম আজহারুল ইসলামের (রংপুর-৩) ফাঁসির রায় রয়েছে। জানা গেছে, ফরিদপুরে মুজাহিদের আসন বাদে বাকিগুলোতে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত।

এ ছাড়া আবদুল আজিজ (গাইবান্ধা-১) ও আবদুল খালেক মণ্ডলের (সাতক্ষীরা-২) বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে মামলা চলেছে বলে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না ধরে নিয়ে জামায়াত নতুন প্রার্থী খুঁজছে।

প্রার্থী বদল হতে পারে মেহেরপুর-১ আসনেও। ২০০৮ সালে এখানে প্রার্থী হয়েছিলেন ছমিরউদ্দিন। ২০১৩ সালে তার ছেলেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে কিছু লোক তুলে নেওয়ার পর তার লাশ পাওয়া যায়। এরপর ছমিরউদ্দিন আর রাজনীতিতে সক্রিয় নন বলে জানা গেছে।

আদালতবিমুখ জামায়াত: ২০০৯ সালে বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন, জাকের পার্টি ও সম্মিলিত ইসলামী জোটের প্রধান নেতারাসহ ২৫ জনের এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট রুল জারি করলেও জামায়াত জবাব দেয় না। ২০১৩ সালের ৩১ আগস্ট হাইকোর্ট বেঞ্চে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়। তিন বিচারকের দু’জন বাতিলের পক্ষে মত দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেও জামায়াত তিন বছর ধরে হাজির না হওয়ায় শুনানি হয়নি।

জামায়াত নেতাদের অভিমত, বর্তমান পরিস্থিতিতে আদালতের রায় তাদের পক্ষে আসবে না। আগামী বছরের শেষ দিকে একাদশ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে। জামায়াত নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একজন আইনজীবী জানান, তখনই এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ট্রাইব্যুনালের রায়গুলোর আলোকে রাজনৈতিক দল হিসেবেই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি করেন অনেকে।

সুপ্রিম কোর্টের ফুল বেঞ্চের সিদ্ধান্তে নির্বাচন কমিশন প্রতীকের তালিকা থেকে ‘দাঁড়িপাল্লা’ বাদ দিয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলই এ প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও আদালতে যায়নি জামায়াত। তফসিল ঘোষণার পর এ বিষয়েও আইনি লড়াইয়ে নামবেন বলে জামায়াত নেতারা জানান।

Facebook Comments