বরিশালে ইচ্ছামাফিক চলে কমিউনিটি ক্লিনিক

আপডেট : March, 22, 2017, 9:30 pm

স্টাফ রিপোর্টারঃনিয়মিত তদারকির অভাবে ইচ্ছমাফিক চলে বরিশালের কমিউনিটি ক্লিনিক। উপজেলা বা ইউনিয়ন সদর থেকে দূরের ক্লিনিকগুলো নিয়ম মেনে খোলার বিষয়টি অনেকটা কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রেভাইডারের (সিএইচসিপি) ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। তবে যেসব কমিউনিটি ক্লিনিক নিয়মিত খোলা হয় সেখানের সেবা পেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন লক্ষিত জনতা। অপরদিকে সংস্কারের অভাবে জীর্ন ভবন, ব্যবহারের অনুপযোগি শৌচাগার, স্যালো টিউবয়েলটিও অকেজো হওয়ার কারণে সেবার কার্যক্রমে বিঘœ ঘটছে বলে অভিযোগ সিএইচসিপিদে’র। এনিয়ে সিভিল সার্জন বললেন, তাদের তদারকি জোরদার করেছেন এবং ভবন মেরামতের কার্যক্রম শীঘ্রই পর্যায়ক্রমে শুরু হবে। সিভিল সার্জন অফিস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রস্থাবিত কমিউনিটি ক্লিনিকের সংখ্যা ৩’শ ১টি। এরমধ্যে ২৭৯টি চালু রয়েছে আর ১টি ক্লিনিক ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। চালু থাকা ক্লিনিকগুলোয় নিয়োগপ্রাপ্ত ২৭০ জন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার কর্মরত আছেন। সিএইচসিপি’র পাশাপাশি শিশুদের টিকা দান কর্মসূচি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেয়ার জন্য একজন স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার কল্যান সহকারী পর্যায়ক্রমে ৩ দিন করে বসার নিয়ম রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ব্যাতয় ঘটায় গেল বছরের চেয়ে রোগির সংখ্যা কমেছে কমিউনিটি ক্লিনিকে। এই অফিসের কীট বিষয়ক কুশলী সানজিদা হোসেনের দেয়া হিসেবে ২০১৫ সালের জানুয়ারী থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলায় নারী, পুরুষ ও শিশু মিলিয়ে ১৭ লাখ ৭২ হাজার ৮৮ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। আর ২০১৬ সালে সেবা গ্রহিতার এই সংখ্যা হলো ১৪ লাখ ৯৩ হাজার ৮৭৬ জন। এই হিসেবে রোগির সংখ্যা কমেছে পৌঁনে তিন লাখের অধিক। তবে কমিউনিটি ক্লিনিকে শিশু প্রসবের সংখ্যা ৪২ থেকে ৩০৩ জনে উন্নীত হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মীরা ধাত্রী বিদ্যার ওপর ৬ মাসের পশিক্ষণ পাওয়ায় বছরের ব্যাবধানে সিসিতে শিশু প্রসবের হার সোয়া ৭ গুন বেড়েছে বলে জানালেন চরকাউয়া ইউনিয়নের পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা সুরাইয়া খাদিজা। সরেজমিন ৭ ফেব্র“য়ারী জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাধা ইউনিয়নের পাংশা কমিউনিটি ক্লিনিক, পশ্চিম পাংশা ও হাদিবাসকাঠি এই ৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে প্রথমটি খোলা, দ্বিতীয়টি সকাল থেকেই তালাবদ্ধ আর হাদিবাসকাঠি সিসি’র কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার আগেই বন্ধ করে বাড়ি ফিরেছেন। খবর পেয়ে তিনি (অনুপ কুমার শীল) ফের ২টার সময় এসে সিসি খুলেছেন। আর পশ্চিম পাংশা ক্লিনিকের সার্ভিস প্রোভাইডার মো. ইমরান হোসেন সকাল থেকেই অনুপস্থিত থাকায় ক্লিনিক তালাবদ্ধ রয়েছে। গেটে তালা দেখে রোগিরা ফিরে গেছেন বলে জানালেন ক্লিনিক সংলগ্ন বাসিন্দা মুক্তা বেগম। আর খোলার দিন কি কারণে কমিউনিটি ক্লিনিকটি বন্ধ এসম্পর্কে ওয়াকিবহল নন কাছাকাছির বাসিন্দা রিপন সিকদার বা খোরশেদ আলম। সিসি’র কোথায়াও সেবা প্রদানকারী মো. ইমরান হোসেন মুঠোফোন নম্বর নেই বলে ফিরে যাওয়া রোগিরাও জানতে পারেননি কবে আসবেন তিনি বা ক্লিনিক খোলা হবে। সদর উপজেলার লামচরি কমিউনিটি ক্লিনিক ১৫ ফেব্র“য়ারী বেলা ১১ টায় তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখা যায়। পাশের দোকানী বলেন, এই ক্লিনিক কখন খোলে আর কখন বন্ধ হয় এ কোন ঠিক ঠিকানা নেই। কমিউনিটি  হেলথ কেয়ার প্রেভাইডার শাহনাজ পারভিনের ইচ্ছাও ওপর নির্ভর করে অনেকটা। এনিয়ে শাহনাজ পারভিনের বক্তব্য হলো ১৫ কিলোমিটার দূর থেকে আসতে হয় বলে এই বিলম্ব। তার চাকুরী হয়েছে ১ নং ওয়ার্ড থেকে কিন্তু নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৩ নং ওয়ার্ডে। বাড়ি থেকে ৩ মিলোমিটার পথ হেঁটে এসে মাহিন্দ্রায় উঠতে হয়। হাদিবাসকাঠি কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি অনুপ কুমার শীল জানান, তিনি ওই দিন স্কুল সংলগ্ন আকন বাড়িতে রোগির স্যালাইন পুশ করতে গিয়েছিলেন। তিনি নিয়মিত

ক্লিনিক খোলেন। ৭ ফেব্র“য়ারী সকাল থেকে তালাবদ্ধ থাকা পশ্চিম পাংশা কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি মো. ইমরান হোসেনের সাথে মুঠোফোনে  যোগাযোগ হলে তার সহজ উত্তর ওদিন তিনি ছুটিতে ছিলেন। ওদিন স্বাস্থ্য সহকারীর ডিউটি ছিল বলে ক্লিনিক খোলা থাকার কথা। তাদের মুঠোফোন নাম্বার টানানো ছিল তা ছিড়ে ফেলেছে কেউবা। ইমরান হোসেন আরো বলেন, তিনি ক্ষুদ্রকাঠি কমিউিনিটি ক্লিনিকে নিয়োগ প্রাপ্ত কিন্তু ৬ মাস হলো পশ্চিম পাংশার সিএইচসিপি চাকুরী ছেড়ে যাওয়ায় তাকে বদলী করে আনা হয়েছে। এতে করে যাতায়াতে সমস্যা হয় বৈকি। এর বিপরীত চিত্র দেখাগেছে ৭ ও  ৯ ফেব্র“য়ারী যথাক্রমে বাবুগঞ্জ উপজেলার পাংশা আর সদর উপজেলার আস্থাকাঠি কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে। পাংশা মডেল দাখিল মাদ্রাসার তত্ত্বাবধায়ক আহ্মদউল্লাহ বলেন, এই ক্লিনিক নিয়মিত খোলা হয়। সেবা প্রদানকারী আশোক কর্মকারের কাছ থেকে সেবা ও পরামর্শ পেয়ে সন্তুষ্ট তারা। আস্থাকাঠি কমিউনিটি ক্লিনিকে সকাল থেকেই রোগির উপস্থিতি দেখা যায়। এখানের সিএইচসিপি খাদিজা শিশু থেকে বৃদ্ধদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। এখানের ইয়াছিন হাওলাদারের স্ত্রী রিপা বেগম এসেছেন শিশু সন্তানের ঠান্ডা লাগায় চিকিৎসা নিতে। বামনীকাঠি খাঁ বাড়ির বধূ তানিয়া আক্তার এসেছেন শিশু কন্যা আনিকাকে নিয়ে। তাদের বক্তব্য সর্দি, কাশি, জ্বর, মাথা ব্যাথা, বমি, পাতলা পায়খানা এসব রোগ হলেই তারা আস্থকাঠি ক্লিনিকে চলে আসেন। ডাক্তার দেখান ওষুধ পান এবং ভালো হন। বড় ধরণের রোগ ছাড়া তাদের আর শহরের হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে যেতে হয় না। পাংশা কমিউনিটি ক্লিনিকের দায়িত্বরত সিএইচসিপি অশোক কর্মকার বলেন, সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার ও সরকারী বন্ধের দিন ব্যাতীত প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত সিসি খোলা থাকে। তার এখানে পালাকরে সপ্তাহে ৩ দিন স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার কল্যাণ সহকারী শিশুদের টিকা প্রদান আর মায়েদের পরিবার পরিকল্পনাজনিত সেবা প্রদান করেন। চলমান বছরের জানুয়ারী মাসে সাধারণ রোগি ৭৮৬ জন, ৫১ শিশু এবং ৬৪ জন গর্ভবতী মায়ের সেবা মিলিয়ে ৯০১ জনের সেবা দিয়েছেন। প্রয়োজনবোধে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগি রেফার করেন। এই সিএইচসিপি আরো বলেন, আগে বক্সে ৩০ আইটেমের ওষুধ থাকতো এখন পাওয়া যায় ২৬ প্রকারের। তাই ওষুধের সংখ্যা বাড়ানো গেলে রোগিদের আরো বেশী সেবা দেয়া যেতো বলে মনে করেন আস্থাকাঠি কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি খাদিজা। এরসাথে জরাজীর্ন ভবন মেরামতের চেয়েও বেশী দরকারী অকেজো হয়ে থাকা স্যালো টিউবয়েলের পরিবর্তে গভীর নলকূপের ব্যবস্থা করা। টয়লেটের অবস্থাও ব্যবহারের অনুপযোগি হওয়ায় সেবার ক্ষেত্রে এসবের জন্য কিছুটা হলেও বিঘিœত হচ্ছে বলে জানান খাদিজা। এনিয়ে বরিশাল জেলা সিভিল সার্জন ডা.এএফএম শফিউদ্দিন জানান, জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছানোর জন্য বর্তমান সরকারের  অগ্রাধিকার দেয়া প্রকল্প হলো কমিউনিটি ক্লিনিক। এর সুপারভিশনে তিনিসহ প্রতি উপজেলায় ট্যাগ অফিসার রয়েছেন। মাসিক সমন্বয় সভায় এর প্রতিবেদন পেয়ে থাকেন। এছাড়াও স্থানীয় সার্পোট গ্রুপের কাছে সিসি’র কর্মীদের জবাবদিহিতার বিয়টি রেখেছেন। তবে যেসব এলাকার হেলথ কেয়ার প্রোভাইডররা বিলম্বে আসেন বা আগে চলে যান, তাদের চিহ্নিত করছেন। স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে এই প্রবনতা রোধে অচিরেই ব্যবস্থা নিবেন। তিনি আরো বলেন, চালু থাকা ২৭৯টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে ১৬০টি মেরামত করা প্রয়োজন। এরমধ্যে বানারীপাড়া উপজেলায় কেবল ১২টি ক্লিনিক মেরামতের প্রশাসনিক অনুমোদন পেলেও অর্থ বরাদ্দ হয়নি। অর্থ পেলে পর্যায়ক্রমে মেরামত করা যাবে। তবে কমিউনিটি ক্লিনিকের কাজের মান ঠিক রাখতে স্থানীয় সহায়ক গ্রুপের মাধ্যমে করালে ভালো হবে বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা।

Facebook Comments