চরম বিপর্যয়ের কবলে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন

আপডেট : March, 31, 2017, 9:07 am

বিশেষ সংবাদদাতা : বেতন-ভাতার দাবীতে শ্রমিক-কর্মচারীদের লাগাতার আন্দোলনের মধ্যে ৬ কাউন্সিলরকে সাসপেন্ড করায় বরিশালের সিটি কর্পোরেশন চরম বিপর্যয়ের কবলে। ক্রমে অচল করে তোলা হচ্ছে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক ও পরিচালন ব্যবস্থা। নগরীর রাস্তাঘাটের পাশে ময়লা আবর্জনার স্তূপ ক্রমশ বড় হচ্ছে।
রাজনৈতিক মামলায় নগরীর ৬ ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে মন্ত্রণালয় থেকে সাসপেন্ড করার সাথে বকেয়া বেতন-ভাতার দাবীতে দৈনিক মজুরীভিত্তিক পরিচ্ছন্ন কর্মী ও শ্রমিক-কর্মচারীদের লাগাতার ধর্মঘটে মহানগরীর সুস্থ জীবন ব্যবস্থা ক্রমশ অচল হয়ে পড়ায় নগরবাসীসহ বিশিষ্ট নাগরিকগণ তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। ইতোপূর্বে কয়েক দফার ধর্মঘটের পরে গত সোমবার থেকে তিন ঘণ্টা করে কর্মবিরতি শেষে এখন নগর ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে লাগাতার আন্দোলন করছে ঐসব শ্রমিক-কর্মচারীগণ। পাশাপাশি পুরো নগরীর ডাস্টবিন থেকে শুরু করে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা গত চারদিন ধরে অনেকটাই পরিচালন ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে নগরীর ৬টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। ঐসব কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ২০১৪ ও ’১৫-এর রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে বিভিন্ন ধরনের মামলা রুজু করে পুলিশ। সেসব মামলায় চার্জশীট দাখিলের পরে মন্ত্রণালয় থেকে তাদের দায়িত্ব পালনে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হল।
গত কয়েক মাস ধরেই বকেয়া বেতন-ভাতাসহ ভবিষ্য তহবিলের অর্থ নিয়মিত জমা করার দাবীতে নগর ভবনের ৭৪২ জন নিয়মিত কর্মচারীর সাথে প্রায় দেড় হাজার দৈনিক মজুরীভিত্তিক কর্মচারীও আন্দোলন করে আসছে। এসব আন্দোলনের প্রেক্ষিতে গত জানুয়ারী থেকে প্রতিমাসের বেতন নিয়মিত পরিশোধসহ ভবিষ্য তহবিলের প্রায় ৫ মাসের অর্থ জমা করার কথা জানিয়েছেন নগর ভবনের দায়িত্বশীল মহল। সিটি করপোরেশনের একাধিক কাউন্সিলরের মতে, ‘সাবেক নগর পরিষদ ৩ মাসের বেতনসহ কয়েক বছরের ভবিষ্য তহবিলের অর্থ বকেয়া রেখে দায়িত্ব হস্তান্তর করে। বর্তমান নগর পরিষদ প্রায় ১৫৪ কোটি টাকার দায় দেনা নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পাশাপাশি নতুন পেস্কেলে বেতন-ভাতা প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধির সাথে সরকারী থোক বরাদ্দ প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে চরম অর্থ সংকটে পড়েছে বর্তমান নগর প্রশাসন। উপরন্তু বর্তমান নগর পরিষদের আমলেই দৈনিক মজুরীভিত্তিক শ্রমিক ও ঝাড়–দারদের মজুরীও প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে।
উপরন্তু ১২শ’ শ্রমিক ও ৪ শতাধিক পরিচ্ছন্ন কর্মীর প্রায় অর্ধেকই কোন কাজ না করেই একটি মহলের প্রচ্ছন্ন যোগসাজশে বছরের পর বছর বেতন তুলছে সিটি করপোরেশন থেকে। এসব শ্রমিক ও পরিচ্ছন্ন কর্মীর এক মাসের বেতন বকেয়া থাকলেও তাদের লালনকারী মুষ্টিমেয় কয়েকজন কর্মকর্তা আন্দোলনে উস্কে দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে শ্রমিকদের ভেতর থেকে। এমনকি পয়ঃনিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্নতার কাজ বন্ধ করে পুরো নগরীকে চরম মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। নগর ভবনের সামনে অবরোধে তাদের বাধ্য করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন বেশ কিছু শ্রমিক ও পরিচ্ছন্ন কর্মী। এমনকি আন্দোলনে যোগ না দিয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এমনকি এসব মজুরীভিত্তিক কর্মীরা এখন তদাদের চাকুরী নিয়মিত করণেরও দাবী তুলছে।
সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা নগর ভবনের পরিচ্ছন্ন বিভাগের দায়িত্বশীলদের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে ‘বর্তমান আন্দোলনকে রাজনৈতিক কারণে মেয়রকে দায়িত্ব থেকে সড়ে দাঁড়াতে বাধ্য করার অপকৌশল’ বলে মন্তব্য করেছেন। ২০১৩-এর জুনে বরিশালসহ ৪টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনেই সরকার দলীয়
মেয়র প্রার্থীগণ পরাজিত হন। ২০০৮-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শওকত হোসেন হিরণ ৬৭৫ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে ২০১৩তে প্রায় ১৮ হাজার ভোটে পরাজিত হন। বরিশালের বর্তমান নগর পরিষদের ৩০ ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ২৫ জনই ৪ দলীয় জোটের। ১০ মহিলা সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলরদেরও অর্ধেকেরও বেশী ঐ জোটের। কিন্তু বিরোধী জোটের এ বিজয়ের পর থেকেই সরকারী তহবিল বরাদ্দ হ্রাসসহ নানাভাবে এ নগর পরিষদকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে তোলা হয়েছে। সাবেক নগর পরিষদ প্রায় ২২ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রেখে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরে এখন তা ২৭ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। এরই মধ্যে বকেয়ার দাবীতে বিদ্যুৎ বিভাগ ১৫ দিনের নোটিশ দিয়ে পানির ৫টি পাম্পের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। মন্ত্রণালয় থেকে তহবিল যোগাড় করে ১৫ দিনের মধ্যে পরিশোধের ওয়াদা করে পুনঃসংযোগ গ্রহণ করার মধ্যেই শ্রমিক-কর্মচারীদের লাগাতার আন্দোলনে এখন বরিশাল নগর পরিষদ প্রায় অচল।
গত দু’দিন সিটি মেয়র আহসান হাবীব কামালসহ কোন কাউন্সিলরই নগর ভবনে যাননি। গতকাল ব্যক্তিগত বাসভবনে কয়েকজন কাউন্সিলরকে নিয়ে মেয়র কয়েক দফা বৈঠক করলেও কোন সমাধান সূত্র বের হয়নি। তবে মেয়রসহ কাউন্সিলরবৃন্দ পর্যায়ক্রমে বেকয়া পরিশোধসহ নিয়মিত বেতন প্রদানের কথা জানিয়ে জনস্বার্থে আন্দোলন প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছেন। এব্যাপারে আন্দোলনকারীদের অন্যতম নেতা ও পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা দিপক লাল মৃধার সাথে আলাপ করা হলে গতকাল বিকেলে তিনি জানান, ‘আন্দোলন চলছে, কর্মচারীদের ৬ দফা ও দৈনিক মজুরীভিত্তিক শ্রমিকদের চাকুরী নিয়মিত করণসহ ৮ দফা না মানলে আন্দোলন বন্ধ হবেনা’ বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, বরিশাল সিটি করপোরেশন-এর প্রায় ৪১ হাজার হোল্ডিংসহ হাট-বাজার ও স্টল থেকে যে আয় হচ্ছে তা দিয়ে বছরের ছয়মাসও সংস্থাপন ও পরিচালন ব্যয় মেটান সম্ভব হচ্ছে না। এর সাথে দেড় সহস্রাধিক শ্রমিক ও পরিচ্ছন্ন কর্মীর পুষতে গিয়ে নগর ভবনের বেহাল অবস্থা। অথচ ঐসব শ্রমিক ও কর্মীর অন্তত অর্ধেকই কোন কাজ না করে বেতন তুলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও নগর ভবনের বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজেও মাথাভারী প্রশাসন এখন গলার কাঁটা। এ অবস্থার মধ্যে গত কয়েক দিনের আন্দোলনে বরিশাল সিটি করপোরেশনসহ গোটা নগরীর সুস্থ জীবন ব্যবস্থা চরম অচলাবস্থার সম্মুখীন। এরই মধ্যে বরিশাল মহানগর বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও ২৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জিয়া উদ্দিন সিকদার, মহানগর যুগ্ম সম্পাদক ও ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দ আকবর, যুবদল নেতা ও ১৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মীর জাহিদুল কবির, মহানগর বিএনপির কৃষি বিষয়ক সম্পাদক ও ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন হাওলাদার, ২৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফিরোজ আহমদ, সদর উপজেলা যুবদল সভাপতি হারুন অর রশিদকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের গত কয়েকদিনের এসব ঘটনাকে পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। তবে সিটি মেয়র এসব বিষয়ে কোন মন্তব্য না করে নগর ভবনের অচলাবস্থা দূরীকরণে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন। অপরদিকে সাসপেন্ডকৃত কাউন্সিলরবৃন্দ আইনের আশ্রয় গ্রহণের কথা জানিয়েছেন।
ইতোপূর্বে সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর প্যানেল মেয়র একেম শহিদুল্লাহ’কে একটি অস্ত্র মামলায় চার্জশীট দেয়ার পরে অনুরূপভাবে সাসপেন্ড করা হয়। উচ্চ আদালতের নির্দেশে তিনি পরে দায়িত্ব ফিরে পেয়েছেন।
সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব
Facebook Comments