বঙ্গবন্ধুকে দেখি নাই কিন্তু হিরণ সাহেবকে দেখিয়াছি

আপডেট : April, 9, 2017, 10:09 am

মোঃ তানভীর সাজেদিন নির্ঝরঃ তখন ২০০৮ সাল, বাংলাদেশের রাজনীতির ভাগ্যাকাশে অনেকটা দুর্যোগের ঘনঘটা। সারা বাংলা জুড়ে চলছে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত রাজনীতিবিদদের জন্যে সংকটময় মুহূর্ত। দেশের শীর্ষ দু’দলের প্রধান যারা তাঁরাও কারাভ্যন্তরে। মাঠ পর্যায়ে সারা বাংলায় দলীয় রাজনীতি করার মতো হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র। তাঁর উপরে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষায় সারাদেশে অবস্থান করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যগণ। প্রধান দুটি দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বাঘা বাঘা নেতারাও কারাগারে বিভিন্ন অভিযোগে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর অনেকটা অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা।

 

এমন একটি মুহূর্তে তৎকালীন তত্বাবধায়ক সরকার দেশের চারটি মহানগরীতে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ঘোষণা দিলেন। শুরু হয়ে গেল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক স্নায়ু চাপ। অন্য তিনটি মহানগরীর কথা জানি না যে সেখানে কেমন ছিলো পরিস্থিতি কিন্তু বরিশালে প্রধান দুটি দল থেকে অনেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছে পোষণ করলেও শেষ পর্যন্ত অনেক সমীকরণের মাঝে হেভিওয়েট প্রার্থীরা তাঁদের পূর্ব কুকর্মের কারনে ধরপাকড়ের ভয়ে সামনে এগিয়ে এলেন না কেউ। এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় একজন সাধারণ রাজনীতিবিদ অবশেষে ইচ্ছা পোষণ করলেন বরিশাল বাসীর দ্বায়িত্ব নেয়ার, তিনি হলেন শওকত হোসেন হিরণ যিনি মাত্র ৩২ বছর বয়সে এই বরিশাল সদর উপজেলা থেকেই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন । অবশ্য তিনি ইচ্ছা পোষণ করার পর অন্য দল সমর্থিত একজন প্রার্থিতা ঘোষণা দেন। শুরু হয়ে যায় জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতার যুদ্ধ। সাধারণ জনগণও বেশ উপভোগ করেছিলেন এই তীব্র প্রতিযোগিতা।অনুষ্ঠিত হলো কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন; নির্বাচন শেষে ফলাফলের অপেক্ষায় বরিশাল বাসী জেগে রইলেন সারা রাত। অবশেষে ফজরের আযানের কিছু পরে আসলো বহু কাঙ্ক্ষিত ফলাফল। শওকত হোসেন হিরণ ৯০০+ ভোটের ব্যাবধানে নির্বাচিত হলেন বরিশালের মেয়র। সাধারণ মানুষ কেউ কেউ খুশি আবার কেউ কেউ সন্দিহান কারণ এই হিরণ সাহেব আওয়ামী রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। আর ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত বরিশালের প্রেক্ষাপটে আওয়ামীলীগ মানেই ছিলো এক অজানা আতংক। তাই হিরণ সাহেব নির্বাচিত হওয়ার পরে তাঁরা কিছুটা শঙ্কিতও ছিলেন।

 

সেই থেকে শুরু এই মহানায়কের পথচলা। শপথ নিয়ে যেদিন বরিশাল পৌঁছলেন সেদিনই দলের সবাই কে জানিয়ে দিলেন আগামীর পরিকল্পনা। হাতে তুলে নিলেন বরিশাল বাসীর সকল দেখভালের গুরু দ্বায়িত্ব। প্রথম একবছরও জনগণ উপলদ্ধি করতে পারে নি যে তাঁরা সঠিক ব্যাক্তিকেই বেছে নিয়েছিলেন। ২য় বছরের শুরুতে বদলে যেতে লাগলো বরিশালের চেহারা। এক আধুনিক সবুজ নগরীতে পরিণত হতে চললো বরিশাল। অন্যদিকে বরিশাল বাসীও কিছুটা চিন্তিত এই ভেবে যে আসলেই কি তাঁরা সবকিছু বাস্তব দেখছে না ঘোরের মধ্যে আছেন। সন্ত্রাসের জনপদ হয়ে গেল শান্তির তীর্থস্থান, অবহেলিত নগরী পেতে শুরু করলো পরিচর্যা, মৃত নগরীতে হতে থাকলো জীবিত। চারদিকে উন্নয়নের ও শান্তির সুবাতাস। সবাই খুব উৎফুল্ল; এতদিনে তাঁরা উপলদ্ধি করতে পারলেন তাঁদের দেয়া ভোট বিফলে যায় নি অন্তত। যা বিগত ৫০ বছরেও পান নি তা কি না মাত্র ৩ বছরেই পেয়ে গেলন !!! বরিশালের আকাশে বাতাসে তখন হিরণ ধ্বনি। এরই মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের শীর্ষ নেতাদের পরম স্নেহে প্রকাশ্যে বুকে জড়িয়ে নিলেন আর ঘোষণা দিলেন আজ থেকে সবাই যার যার পছন্দ মতো দলের রাজনীতি করবেন আর এতে

যদি কেউ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তবে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যাবস্থা নেয়া হবে। কোন দল নাই, কোন গ্রুপ নাই; বরিশাল হবে রাজনৈতিক সহাবস্থানের নগরী। যে ভাবনা সেই কাজ বাস্তবায়িত হতে খুব বেশী বেগ পেতে হয় নি। বরিশাল হয়ে উঠলো শান্তিময় এক ভূখণ্ড।

 

একদিন রাতে বরিশালের বাইরে থেকে ফিরছিলেন; পথে দেখলেন একটি বালু বোঝাই ট্রাক বেপরোয়া গতিতে ছুটে যাচ্ছে। দেখে আর মেনে নিতে পারলেন না জনপ্রতিনিধি, ট্রাক কে অনুসরণ করে ধাওয়া দিয়ে ধরলেন এবং পুলিশে সোপর্দ করলেন চালক কে। প্রায় রাতেই একখানা লুঙ্গি আর একটি গেঞ্জি পড়ে দেখতে বের হতেন তাঁর বরিশাল কে। সরকারী প্রটোকল বাদ দিয়ে রিকশায় চেপে ঘুড়ে বেড়াতেন আর যেখানেই খটকা লাগতো সেখানেই থেমে যেত রিকশার চাকা। রাস্তার পাশের দোকানে একবার দোকানদার সিঙ্গারা বিক্রি করছিলেন আর কিছু ক্রেতা খাচ্ছিলেন গরম সিঙ্গারা, হঠাত দেখলেন একটি পতাকাবাহী গাড়ি থেমে গেল, নেমে এলেন মেয়র। ঘাম মুছতে মুছতে অন্য ক্রেতাদের সাথে বসে তিনিও খেলেন সিঙ্গারা। দোকানদার তো বিশ্বাস করতেই পারছিলেন না যে মেয়র তাঁর এই দোকানে এসে সিঙ্গারা খাবেন।

 

এভাবেই চলতে লাগলো বরিশালের অগ্রগতির চাকা। এক পর্যায়ে তিনি হয়ে গেলেন মধ্যমণি। এমন মানুষও দেখেছি যারা তাঁকে একদিন না দেখলে বাসায় চলে যেতেন তাঁর খোঁজ নিতে। আর বঞ্চিতদের সাহায্যে সহযোগিতার কথা নাই বা বললাম। তাঁর দুয়ারে গেছেন আর আশাহত হয়ে ফেরত এসেছেন এমন মানুষ হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না একজনও। যার যেখানে যে সমস্যা সাধ্যমত সমাধান করাই ছিলো তাঁর চিন্তা চেতনা। অনেক নেতা কর্মীকে দেখেছি কুকর্ম করে তাঁর সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করতো কিন্তু বিধি বাম, তাঁদেরই ভুগিয়ে ছাড়তেন সবচেয়ে বেশী। কাউকে ধরে থানায় নিয়ে গেলে যদি তদবিরের জন্যে তাঁর কাছে ফোন আসতো তবে বলতেন অফিসার কে দাও, এটা শুনে অপরাধী তো খুশীতে অস্থির কিন্তু অফিসার যখন কথা শেষ করে ডান্ডার বেতানি আরো দু তিনটি বেশী দিতেন তখন তদবিরকারি টের পেতেন যে আসলে কি হয়েছে। আশাকরি আপনারাও বুঝতে পারছেন তিনি কি বলেছেন অফিসার কে। আর টেন্দারবাজি নামে যে কিছু আছে তাও ঐ পাঁচ বছরে ভুলে গিয়েছিলো বরিশালের জনতা।

 

গত নির্বাচনে দলীয় কোন্দলের কারনে তিনি পরাজিত হয়ে যান কিন্তু ব্যাক্তি হিরণ জয়ী হন মানুষের মনে। আবার ২০১৪ তে এসে সুযোগ মেলে বরিশালের জন্যে কিছু করার কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস সকল আশা কে নিরাশায় পরিণত করে চলে যান না ফেরার দেশে। লক্ষ লক্ষ ভক্ত-অনুরাগির অশ্রুসিক্ত বিদায় নিয়ে তিনি এখন চিরশয়ানে মায়ের পাশে।

 

যুগে যুগে এমন লোক খুব কমই দেখেছে দেশবাসী। আর আমি তো বঙ্গবন্ধু কে দেখিনি, তখন আমার জন্মও হয় নি কিন্তু দেখলাম শওকত হোসেন হিরণ কে যিনি জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত ভেবে গেছেন মানুষের মঙ্গলের কথা। যে কর্ম করে গেছেন, ভালোবাসা দিয়ে গেছেন তাঁর মাঝেই বেঁচে থাকবেন চিরকাল। বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন “ আমি হিমালয় দেখিনি। কিন্তু আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি।” আর আমি একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে বলতে চাই “বঙ্গবন্ধু কে দেখি নাই কিন্তু হিরণ সাহেব কে দেখিয়াছি “।

লেখাটি বিডি নিউজ থেকে সংগৃহীত

Facebook Comments