শওকত হোসেন হিরণঃনিজেই যার উপমা

আপডেট : April, 5, 2017, 9:24 am

তৃতীয় মৃত্যু বার্ষিকীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রফেট অব নন ভায়োলেন্স মহাত্মা গান্ধী নিহতের পর শোক বার্তায় নোবেল বিজয়ী জর্জ বার্নাড শ’র উক্তি ছিল- To be too good is a dangerous things. এমনটা শওকত হোসেন হিরণের বেলায়ও প্রযোজ্য। সাধারণের জন্য আশীর্বাদ হলেও কারো কারো জন্য খুউব ভালোটা ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল। এমন উপমা হাজারো। যার দু-একটা বিধৃত করছি।
বিধান সরকারঃ গেল সিটি নির্বাচনে কাজ করছিলাম বালুর মাঠ স্লামে। এখানে ক্যামেরা তাক করে মাইক্রোফোন ধরেছিলাম সত্তর ছুঁই এক ব্যক্তির পানে। কোয়েশ্চেন-এই স্লামে মেয়র শওকত হোসেন কতটুকো কাজ করেছেন? জবাবটা ছিল, স্বাধীনতার পর একমাত্র মেয়র হিরণই আমাদের বস্তির যথেষ্ট উন্নয়ন করেছেন। স্যানিটেশন, বিদ্যুতায়ন, রাস্তা এসব তারি অবদান। এবার তাকেই আমরা ভোট দেব ফের। এই বয়স্যের কথায় একযোগে সায় দিয়েছিলেন এসময় উপস্থিত বালুর মাঠ স্লামের অন্যরা। তাৎক্ষণিক মনে হল এখানের নব্বই ভাগ ভোট পাচ্ছেন শওকত হোসেন। ভোটারদের প্রতি এমন আস্থা দেখেছি নির্বাচনের আগের দিন সন্ধ্যায় তার প্লানেট ওয়ার্ল্ডের একটি কক্ষে কমেন্টস্ নেয়ার সময়। জানালাম আপনি আমার পৈত্রিক নিবাস ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে কাঙ্খিত ভোট পাচ্ছেন না। দেখলাম সব ছাপিয়ে তার উন্নয়নের কাজে ভোটারদের প্রতি পুরোটাই নির্ভার। কাঙ্খিত ফল না হলে কি করবেন? এর জবাবে স্মীতহাস্যে বলেছিলেন, ফলাফল যেটাই হোক মেনে নিবেন। ১৫ জুন’২০১৩ মধ্যরাতে ভোটের ফল বিরুপ প্রমাণিত হলো। ঢাকা থেকে এ্যাসাইনমেন্ট বিজয়ী ও বিজেতার কমেন্টস্ দরকার। ১৬ জুন সকাল দশটা হবে বৈকি। কর্মী সমর্থকরা শোকে কাতর আলেকান্দার বাসভবনে। নগরবাসি যারা আসছেন তারও থ বনে যাওয়া অবস্থায়। দ্বিতলে সমর্থকদের সামনে বসা শওকত হোসেন। ক্যামেরা পারসন জসিমউদ্দিনের অভ্যাস কাঙ্খিত ছবির বেলায় সব বাঁধা উপেক্ষিত হয় ওর কাছে। ছবি তুলতে থাকলেন। এসময় শোকাতুর এক যুবকের উচ্চস্বরে বারণ-ছবি তুলছেন ক্যান, ছবি তোলা যাবেনা। কথাটি হিরণ ভাইর কানে বাজতেই যুবকের পানে পাল্টা জবাব দিলেন এই বলে-নৈইশার পো বড় বড় লোকে তো কতকিছু করছে, ওনাদের দোষ কোথায়। তাবলি দোষ যারা করেছিলেন তারা যেমন শওকত হোসেনের কাছে চিহ্নিত হয়েছিলেন, তেমনটা জানতে পেয়েছিলেন দলীয় প্রধান পর্যন্ত। তাই সবকিছু উপেক্ষা করে আর পছন্দের বলে এক সময়ের জন নন্দিত মেয়রের বেদনা প্রশমনে, বরিশাল সদর আসনের সাংসদ পদে মনোনয়ন দিলেন শেখ হসিনা। এর নেপথ্যে কারণও আছে বটে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বরিশাল অঞ্চলের ভোটাররা আওয়ামীলীগীকে বিজয়ী করলেও সদর আসন আর করপোরেশন ছিল অধরা। নেপথ্যের কারণ বলতে সাধারণের আস্থায় ছিলেন না আওয়ামীলীগের কোন নেতা। ২০০৮ সালে এই অচলাবস্থার বৃত্ত ভেঙ্গে আওয়ামীলীগের পক্ষে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন শওকত হোসেন হিরণ। এ বিজয় যেমন বরিশাল নগরীতে আওয়ামীলীগের সমর্থক বাড়াতে সহায়ক হয়েছিল তেমনি বদলে দিয়েছিল শওকত হোসেনকে। জন আস্থায় তিনি হয়ে উঠলেন গণমানুষের নেতা। নিজের পরিচ্ছন্ন আর রুচিশীলতার ছাপ রেখেছিলেন নগর উন্নয়নে। অপব্যাখ্যা, আর কুটকৌশলের কাছে দ্বিতীয়বার মেয়র নির্বাচনে পরাস্ত হলেও শওকত হোসেন হারেননি। ঢাকা অফিস থেকে ফের এ্যসাইনমেন্ট ভোটের এমন ফলাফলের নেপথ্যের কারণ কি? জনমত ছিল হিরণ হারেনি, হেরেছে আওয়ামীলীগ। হিসাব কষে দেখালেন জনতা, প্রথম বারের চেয়ে দ্বিতীয় নির্বাচনে হিরণ প্রায় ২০ হাজার ভোট বেশী পেয়েছেন। বিপরীতে বিএনপির কমেছে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার ভোট। তাই জনতার দাবী তারা বিমুখ করেননি তাদের প্রিয়

নেতাকে। বিশ্লেষকরা বললেন, জাতীয় ইস্যু বলতে ওসময়ে হেফাজতের উত্থান, বিদ্রোহী প্রার্থী আর শীর্ষ নেতাদের আন্তরিকতার ঘাটতি, ফলাফলের নেপথ্যে এই তিনটি বিষয় প্রভাব ফেলেছে। আওয়ামীলীগ নেতারাও বলেছিলেন কতিপয় বন্ধুরা নিষ্ক্রিয় ছিলেন।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হিরণ সাংসদ হলেন বরিশাল সদর আসনের। এবার শুধু নগর নয়; বদলে দেবেন পুরো সংসদীয় এলাকা। এমন প্রত্যাশার কথাই জানিয়েছিলেন পুরানো সহযোদ্ধা জাগুয়ার মন্টু মেম্বরকে। কেবল সহযোদ্ধা বা কর্মীদের নয়, চিনতেন তার সমর্থকদের। মনে রাখতেন পারতেন নতুন কোন আগন্তুককেও। শুরুর দিকে নগর ভবনে তার একান্ত কামরায় ইন্টারভিউ করছিলাম। ওসময় আমাকে আগন্তুক হিসেবে ভাবলেও পরবর্তীতে দূর থেকে দেখলেও সম্বোধন করতেন, নিজ থেকে কাছে ডাকতেন। এমন করেই কাছে ডাকতেন কলোনীর বাসিন্দাদের থেকে শুরু করে শ্রমজীবী মানুষদের। তাইতো কথা ওঠে অটোরিক্সার লাইসেন্স লুটেপুটে খাওয়া চলমান সময়ে। শওকত হোসেন মেয়র থাকলে দশ হাজার টাকার লাইসেন্স এক লাখ একচল্লিশ হাজার টাকায় কিনতে হতোনা। হিরণ মিয়ার নজর এত নিচু ছিলনা, তিনি গরীবের হক মারতেন না। এমন বহু উপমা উচ্চারিত হয় এই নগরীতে। কেবল এই নয়; শওকত হোসেন এখনো অটুট তার অগনন সমর্থকদের মাঝে। সম্প্রতি চরকাউয়া খেয়াঘাট এলাকায় এক ক্ষুদ্র ব্যাসায়ীর সাথে কথা হলে বলেন-হিরণ ভাই বললে এহনো জান দিয়া দিমু। দেখুন আজো ওই সমর্থকের ভাবনায় নেই তার প্রিয় নেতা শওকত হোসেনের অনুপস্থিতির বিষয়টি। এমন অগনন কর্মী, সমর্থক, খেটে খাওয়া মানুষ, যারা শওকত হোসেনের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিলেন। সবাই কাজ বা পাওয়ার আশে নয়; হিরণের ব্যাবহারেও মুগ্ধ হয়েছেন এমন উপমাও ঢেড়। এমন বানের স্রতের মত কর্মী-সমর্থক, গোছানো মাঠ, জোর কদমে এগিয়ে চলা তলে তলে ক্ষয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষয়ে যাওয়ার যাত্রা শুরু হয়েছিল ৯ এপ্রিল’১৪ বুধবার সকাল ৭টায় জননন্দিত শওকত হোসেনের অনন্তপাড়ে চলে যাওয়ার খবরে। শোকাহত কেবল বরিশাল নগরবাসী নয়, তাবৎ দক্ষিণাঞ্চল ছাপিয়ে দেশ ও প্রবাসের কোথাওবা। পরদিন ১০ এপ্রিল দুপুর বারোটা থেকেই বঙ্গবন্ধু উদ্যানে শোকাহত মানুষের ঢল নামে। প্রিয় মানুষটি আসবে, শেষ দেখাটা দেখতে পাবে। ওই দিনও সকাল থেকে প্রতি নিউজ আওয়ারে লাইভ করে চলছি, আর বিরতির মাঝে জনতার আহাজারি দেখছি কমেন্টস্ নিচ্ছি। জেলা খেলাঘরের একসময়ের সাধারণ সম্পাদক শুভঙ্কর চক্রবর্তীর মন্তব্যটি ছিল বাস্তবতায় জড়ানো কঠিন সত্য। এক কথায় তিনি বলেছিলেন-জীবিত হিরণের চেয়ে মৃত হিরণ অনেক শক্তিশালী। ব্যাখ্যায় বললেন, বরিশাল নগরীকে তিনি যে রূপ দিয়েছেন, জনতাকে এমন ভাবে বুঝেছেন, তাতে পরবর্তীতে কোন নেতার জন আস্তায় ফেরতে প্রচন্ড বেগ পেতে হবে। তখনই উঠে আসবে হিরণ ভাই এমনটি করেছেন আপনি কেন নয়? এই প্রশ্ন শুরু থেকে আজো বরিশাল নগরীতে উত্থাপিত হয়। এমনটা চলবে হিরণসম নেতৃত্ব বা তাকে ছাপিয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত। এটা হতে পারে যুগের পর যুগ ধরে। কেননা শওকত হোসেনের অনুরাগীরা আস্থা পাচ্ছেন না লুটেরাদের ভিড়ে। আর এই রেশেই জনতার বিকল্প খোঁজার মাশুল সামনের নির্বাচনে বরিশালে গোনবে আওয়ামীলীগ। তারপরও রাজনীতির কৌশলী হিসাব ছাপিয়ে কোন অনুরাগীর মাঝে হিরণ জেগে রইবে। কখনোবা তার শুষ্ক আঁখি ভিজে যাবে, আর হিয়াখানি যাবে গলে।

লেখাটি সংগৃহীত

Save

Facebook Comments