বরিশালের সম্ভাবনার আরেক নাম জাহাজ নির্মাণ শিল্প

আপডেট : April, 5, 2017, 4:12 pm

বরিশাল : এক যুগেরও বেশি সময় হয়েছে বিভাগ ঘোষনা কিন্তু বরিশালে আসানরুপ ভাবে গড়ে ওঠেনি শিল্প প্রতিষ্ঠান। তবে গত প্রায় এক দশক ধরে জাহাজ নির্মাণ শিল্প দক্ষিনাঞ্চলে সম্ভাবনার পথ দেখিয়ে আসছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে জাহাজ নির্মাণ শিল্প, প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় বেশ কয়েকটি শিপইয়ার্ড। যেগুলোতে অত্যাধুনিক বিলাসবহুল যাত্রীবাহী লঞ্চ, কার্গো জাহাজ, কোস্টার ও অয়েল ট্যাংকার একের পর এক নির্মাণ হচ্ছে । ফলে কিছুটা হলেও বেকারত্ব দূর করে অর্থীনতির চাকা সচল রাখতে ভূমিকা রেখেছে জাতীয় অর্থনীতিতে। মওয়ায় পদ্মা সেতু আর পটুয়াখালিতে পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর চালু হলে এর চাহিদা কয়েক গুন বাড়বে বলে আশাপ্রকাশ করেছে বিনিয়োগকারীরা। শিল্প মালিকরা বলছেন বরিশালেই এখন বিশ্বমানের জাহাজ তৈরি করা সম্ভব। নদীর ভাঙন রোধ,  গ্যাসের সমস্যার সমাধান আর সহজলভ্য ব্যাংক ঋণ পেলে আরো এগিয়ে যাবে বরিশালের জাহাজ নির্মাণ শিল্প। সূত্রমতে, বরিশালে সর্বোপ্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বে ১৯৬৯ সালে দিকে খাজা ডকইয়ার্ড এন্ড শিপ বিল্ডার্স নামে একটি ডকইয়ার্ড সদর উপজেলার চরকাউয়া ইউনিয়নের নয়ানী এলাকায় সাহেবের হাট খালের পাশে তৈরি হয়। যা তৈরি করেন এখানকার বিশিষ্ট লঞ্চ ব্যবসায়ী সাবেক পৌর চেয়ারম্যান প্রয়াত গোলাম মাওলা। এরপর তারাই বরিশালে প্রথম আধুনিক জাহাজ নির্মানের ভিত গড়েছিলো ১৯৯৮ সালে কীর্তনখোলা নদীর বেলতলা পয়েন্টে খাজা ডকইয়ার্ড এন্ড শিপ বিল্ডার্স-২ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। সেখান থেকেই ২০০২ সালে একই মালিকানাধীন ক্রিসেন্ট শিপিং লাইন্সের যাত্রীবাহি লঞ্চ সুরভী ৪ নির্মান করা হয়। এরপর থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত সুরভী ৬, সুরভী ৭, ও সুরভী ৯ এর মতো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত লঞ্চ তৈরি করা হয়। পাশাপাশি এই শিপইয়ার্ডে এখন পর্যন্ত তৈরি হয়েছে ৮-১০ টি কার্গো ভেসেল। যারমধ্যে সেভেন সীজ ২,৩,৪ নামে তিনটি কার্গো শিপইয়ার্ডের মালিকপক্ষের নিজেদেরই। ২০০৩ সালে খাজা ডকইয়ার্ড এন্ড শিপ বিল্ডার্স এর পাশেই কীর্তনখোলা নদীর তীর ঘেঁষে সুন্দরবন শিপইয়ার্ড গড়ে তুলেছেন বরিশাল চেম্বার অব কমার্স-এর সভাপতি ও লঞ্চ মালিক সমিতির সহ-সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু। ঢাকা-বরিশাল ও ঢাকা-পটুয়াখালী রুটে নিজের মালিকানাধীন অত্যাধুনিক যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি সুন্দরবন-৭, ৯, ১০, ১১, ১২ নির্মাণ করা হয়েছে এই শিপইয়ার্ডেই। পাশাপাশি অন্যের মালিকানাধীন বরিশাল-লক্ষীপুর রুটের আধুনিক এমভি পারিজাত নামের জাহাজটিও তৈরি হয় এই শিপইয়ার্ডে। পাশাপাশি এখানেও নিজেদের ও এম.ই.পি কোম্পানির কয়েকটি কার্গো ভেসেল তৈর করা হয়। সুন্দরবন শিপইয়ার্ডের কাছাকাছি দূরত্বেই রয়েছে বাগেরহাট শিপ বিল্ডার্স নামের

একটি শিপইয়ার্ড। ২০০২ সালে মঞ্জুরুল আহসান ফেরদৌসের মালিকানাধীন ওই শিপইয়ার্ডে তৈরি হয়েছে এমভি কীর্তনখোলা-১ ও ২ লঞ্চ। বর্তমানে নির্মিত হচ্ছে ৩০৫ ফুট দীর্ঘ ও ফ্যান্টারসহ ৫৯ ফুট প্রস্থের বিশাল একটি যাত্রীবাহি জাহাজ কীর্তনখোলা ১০। এটির নির্মাণকাজ শেষ হলে আরও চারটি পণ্যবাহী জাহাজ নির্মাণ করবে তারা। এদিকে ঢাকা-বরিশাল রুটে দিবা ও রাত্রিকালিন সার্ভিসের জন্য একসাথে ৪ টি জাহাজ নির্মান করে সারা ফেলেছে নলছিটির দপদপিয়ায় কীর্তনখোলা নদী তীরে অবস্থিত অ্যাডভেঞ্জার শিপবিল্ডার্স। এই শিপইয়ার্ডটি ২০১১ সালে যাত্রা শুরু করে ৮ টি কার্গো ভেসেল ও তেলের ট্যাংকার তৈরি করেছে। সবগুলো শিপইয়ার্ডেই কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে ব্যবসায়ীরা। সম্ভাবনাময় এই শিল্পে তবে নদী ভাঙন, গ্যাসের অভাব আর ব্যাংক ঋণের কারনে তারা অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছেন। অ্যাডভেঞ্জার শিপবিল্ডার্সের সত্ত্বাধিকারী মোঃ নিজাম উদ্দিন বলেন, দক্ষিনাঞ্চলে পায়রা বন্দরকে ঘিরে জাহাজ নির্মান শিল্পের সম্ভাবনা অনেক বেশি। শুধু পায়রা বন্দরকে ঘিরে যে সব জাহাজের দরকার হবে তা এই অঞ্চলেই তৈরি করা সম্ভব। নদী বেষ্টিত এ অঞ্চলে এখন দক্ষ শ্রমিক রয়েছে। কাচামাল ব্যতিত শ্রমিক ও সামগ্রিক দিক থেকে এখানে জাহাজ নির্মানে ব্যয় ও কষ্ট কম। তিনি বলেন, একসময় ছিলো চিটাগাং নয়তো বিদেশ থেকে জাহাজ তৈরি করে আনা হতো, কিন্তু এখন সেই মানের জাহাজ তৈরি হওয়ায় বরিশাল অঞ্চল থেকেই জাহাজ তৈরি করে বিদেশে রপ্তানী করা যাবে। সরকারের বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী নতুন কাচামাল অনেক কম খরচে আনা যায়। পাশাপাশি বিদ্যুতের ঘাটতি না থাকায় তেমন কোন সমস্যা হচ্ছে না। তবে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত ও সরকারের ঘোষনা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের তফসিলভূক্ত ব্যংকগুলো যদি এ শিল্পে বিনিয়োগে সহায়তা করে দেয় তবে আরো অগ্রগতি ঘটবে। খাজা শিপবিল্ডার্স ও সুরভী গ্রুপ অব কোম্পানির পরিচালক রিয়াজ উল কবির বলেন, জাহাজ নির্মানের এ খাতকে এখনো শিল্প হিসেবে ঘোষনা দেয়া হয়নি, অথচ এরইমধ্যে দক্ষিনাঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে জাহাজ নির্মান শিল্পের অপার সম্ভাবনা। একসময় ছিলো কেউ বরিশালে এসে কাজ করতে চাইতো না, সবাই ভয়পেতো আর এখন দক্ষশ্রমিকের কোন ঘাটতি নেই। ব্যয় ও হচ্ছে অন্য জায়গার থেকে অনেক কম। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে নদী ভাঙনের কারনে অনেক শিপইয়ার্ড-ই রয়েছে হুমকির মুখে। খাজা শিপইয়ার্ডের দেড় একর জমি এরই মধ্যে র্কীতনখোলায় বিলীন হয়ে গেছে। নতুন করে জায়গা খোজা হচ্ছে। আবার সুন্দরবন ও বাগেরহাট শিপবিল্ডার্স নামের দুটি ইয়ার্ড রয়েছে ঝুকির মধ্যে। এসব দিকে সরকারের দু-দৃষ্টি কামনা করেন তিনি।

Facebook Comments