আমতলীতে চাষীদের মাথায় হাত

আপডেট : March, 11, 2017, 9:06 pm

আমতলী  প্রতিনিধি ॥
উত্তর বঙ্গোপসাগরে গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালা তৈরীর কারনে বুধবার দুপুর থেকে শনিবার বিকেল পর্যন্ত আমতলীতে  ভারী বৃষ্টি পাতের কারনে তরমুজ ক্ষেতে পানি জমে জাওয়ায় প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমির তরমুজ গাছ পঁচে প্রায় ৫ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষক ও কৃষি বিভাগ।

আমতলী উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, এবছর আমতলী উপজেলার হলদিয়া, আঠারগাছিয়া, কুকুয়া, চাওড়া ও আমতলী ইউনিয়নে  ৫ হাজার হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষের লক্ষমাত্র ধরা হয়েছে। চাষ হয়েছে ৩ হাজার ৫শ’ হেক্টর জমিতে। পৌষ এবং মাঘ  মাসে রোপন করা তরমুজ গাছে বর্তমানে ফলন আসতে শুরু করেছে। এসময় উত্তর বঙ্গোপস সাগরে গভীর সঞ্চালন শীল মেঘমালা তৈরীর কারনে আকস্মিক বুধবার দুপুর থেকে শনিবার বিকেল পর্যন্ত আমতলীতে  থেমে থেমে ভারী বৃষ্টি পাতের কারনে দেড় হাজার কৃষকের প্রায় ২ হাজার হেক্টর তরমুজ ক্ষেত পানিতে তলিয়ে জায়। তলিয়ে জাওয়া এসকল ক্ষেত কৃষকরা মেশিন বসিয়ে সেচ দিয়ে রক্ষার শেষ চেষ্টা করেও  বৃষ্টির কারনে  ব্যার্থ হচ্ছে।
শনিবার দুপুরে পাওড়ার পাতাকাটা,পাতাকাটা, হলদিয়ার রাওঘা, টেপুরা ও আঠারগাছিয়া ইউনিয়নের সোনাখালী গ্রাম সরেজমিন ঘুরে  দেখা গেছে, শত শত হেক্টর জমির তরমুজ গাছ প্রায় এক থেকে দেড় ফুট পানির নীচে রয়েছে।  গাছে গাছে ফুল আর ফলে ভরে গেছে। কিন্তু সেকল গাছ এখন বাঁচার জন্য পানির সাথে  যুদ্ধ করছে। কৃষকরা তাদের লাগানো তরমুজ গাছ বাঁচানোর জন্য নারী পুরুষ আবাল বৃদ্ধ সবাই বালতি, থালা বাসন আর মেশিন লাগিয়ে সেচ দিয়ে ক্ষেত থেকে পানি সরানোর শেষ চেষ্ঠা করছে। কয়েকজন কৃষক হতাসার সুরে বলেন আর পারছিনা। কয়েকজন কৃষক জানান, ধার দেনা আর বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তরমুজ চাষ করে কৃষকরা লাভের আশায় বুক বেধেছিল কিন্তু  মৌসুমের আকস্মিক ভারী বৃষ্টি পাতের ফলে ক্ষেত তলিয়ে জাওয়ায় কৃষকের  মাথায় এখন হাত পড়েছে। কিভাবে ধার দেনা  আর এনজিওর ঋণ শোধ করবে সে চিন্তায় এখন তারা অস্থির হয়ে পড়েছে।


চাওড়ার পাতাকাটা গ্রামের তরমুজ চাষী দেলোয়ার হাওলাদার জানান, দুই একর জমিতে ৫০ হাজার টাহা খরচ কইরা লাভের আশায় ধার দেনা কইরা তরমুজ লাগাইছিলাম। গত ৪ দিনের দেওইয়তে ক্ষ্যাত তলাইয়া যাওয়ায় মোগো সব শ্যাষ অইয়া গেছে। এহন মাইনসের ধারের টাহা দিমু কি দিয়া।
একই গ্রামের আরেক চাষী খোকন হাওলাদার কান্না জড়িত কন্ঠে ক্ষেতে পানি সরানোর

সময় বলেন, মুই এনজিওর ৬০ হাজার টাহা লোন আইন্যা তরমুজ দিছি। পানতে সব ম্যাষ অইয়া গেছে এহন কি দিয়া লোন শোধ করমু। এহন মোর ঢাহা যাওন ছাড়া উপায় নাই।
আঠারগাছিয়া ইউনিয়নের মধ্য সোনাখালী  গ্রামের তরমুজ চাষী নূর হোসেন হাওলাদার জানান, মুই একটি বাড়ি একটি খামার থেকে ৩০ হাজার টাকা লোন নিয়া এবং ধার কইরা আরো ৩০ হাজার টাহা লইয়া তরমুজ লাগাইছিলাম। দেওইতে পানি জইমা সব গাছ নষ্ট অইয়া গেছে। পানি সইরা গেলেও এই গাছ এহন আর বাচবে না। মোগো পথে না ছাড়া আর কোন উপায় নাই।
মধ্য সোনাখালী গ্রামের আরেক চাষী নানির প্যাদা ওরফে হামজা জানান, এনজিও সংগ্রাম ও কোডেক থেকে ৩লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এবং গ্রামের মহাজনের নিকট থেকে ১ লাখ টাকায় মাসে ২হাজার টাকা সুদে এনে ৪ লাখ টাকা  খরচ করে ৮ একর জমিতে তরমুচ চাষ করছি। গত ৪ দিনের ভারী বৃষ্টিতে খ্যাত তলাইয়া যাওয়ায় আমার সব শ্যাষ হইয়া গেছে। ক্ষেতে তরমুজ পাব এখন সেই আশা ভরসা ছাইরা দিছি।
টেপুরা গ্রামের রিপন  ও কাঠালিয়া গ্রামে মজনু মোল্লা জানান, মধু মোল্লা তরমুজ চাষ কউলা মোরা এবার পথের ফকির অইয়া যামু। বৃষ্টিতে খ্যাত নষ্ট হওয়ায় প্রায় ৫ লাখ টাকা লোকসান হবে।
কুষি বিভাগ জানায়, এক হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ করতে খরচ হয় প্রায় ২৫ হাজার টাকা। আমতলীতে এবছর ৩ হাজার ৫শ’ হেক্ট জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে এতে কৃষকের খরচ হয়েছে  ৮ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা। উৎপাদন ধরা হয়েছে ১লক্ষ ৪০ মেট্টিক টন। টাকায় আয় ধরা হয়েছে ১৪ কোটি টাকা। কিন্তু আকস্মিক বৃষ্টিতে প্রায় ২হাজার হেক্টর জমির তরমুজ ক্ষেত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। এতে প্রায় ৫ কোটি টাকার ক্ষতি হবে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষি বিভাগ।
বেসরকারী সংস্থা সংগঠিত গ্রামো উন্নয়ন (সংগ্রাম) এর এরিয়া ম্যানেজার মো: ফয়সাল হোসেন জানান, এবছর আমতলী উপজেলায় তরমুজ ৩ শ’ ৫০ জন কৃষককে দেড় কোটি টাকার উপরে ঋণ দিয়েছে। তরমুজ ক্ষেত নষ্ট হলে আমাদের ঋণের টাকা আদায় করা খুব কষ্টকর হবে।
আমতলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এসএম বদরুল আলম জানান, আমতলী উপজেলায় এবছর ৩হাজার ৫ শ’ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। মৌসুমের আকস্মিক বৃষ্টিতে প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমির তরমুজ প্রায় ১ থেকে দেড় ফুট পানির নীচে রয়েছে। পানি সড়ে গেলেও এসকল তরমুজ গাছ মরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।এতে কৃষকের ক্ষতির পরিমান হবে প্রায়  ৫ কোটি  টাকা। তবে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে ক্ষেতে পানি জমে যাওয়ায় মুগ, বাদাম, মরিচ, সূর্য্যমুখীসহ রবি ফসলের ব্যাপক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।

Facebook Comments