[english_date], [bangla_day]

বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের নাম নারী ও শিশু নির্যাতন

আপডেট: February 20, 2019

নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিধি অনেক বিস্তৃত
নির্যাতনের শিকার বেশি ঘরে বা চেনা গণ্ডিতে
বিষয়টি বাংলাদেশের উন্নয়নকে ঝুঁকিতে ফেলছে
সুরক্ষার জন্য চ্যালেঞ্জের শিকড় গভীরে
সরকারের সামনে বড় ও বহুমাত্রিক এক চ্যালেঞ্জের নাম নারী ও শিশু নির্যাতন। যৌন বা শারীরিক নির্যাতন, হয়রানি, হত্যা-অপহরণ, বাল্যবিবাহ—এ সবই নারী-শিশুর সুরক্ষা ও অগ্রযাত্রাকে ঝুঁকিতে ফেলছে। এগুলোর প্রতিরোধ এবং প্রতিকার—দুটিই বড় চ্যালেঞ্জ।

Eprothom Aloধর্ষণ-গণধর্ষণ, ধর্ষণজনিত হত্যা, যৌন হয়রানি ও আত্মহত্যায় প্ররোচনা—যৌন নির্যাতনের মাত্রা অনেক। তবে ব্যাপকতা বেশি শারীরিক নির্যাতনের। বাল্যবিবাহ এখনো প্রকট। দূর হয়নি অ্যাসিড-সন্ত্রাস বা যৌতুকের জন্য নির্যাতন ও হত্যা।

একাধিক জরিপ ও গবেষণা আরও বলছে, নারী ও শিশুরা নির্যাতনের শিকার বেশি হচ্ছে নিজের ঘরে অথবা চেনাজানার গণ্ডিতে। শিশুর সুরক্ষার বিশেষ চ্যালেঞ্জ ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম, অপহরণ ও হত্যা।

অর্থনীতিবিদ আর অধিকারকর্মীরা বলছেন, সুরক্ষার অভাব নারীর এগিয়ে চলার পথ আটকে দিচ্ছে। তাঁরা বলছেন, সহিংসতা প্রতিরোধের কাজটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। এর গোড়া পরিবারে, সমাজে বিদ্যমান নারীর প্রতি বৈষম্যের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে। মোকাবিলার জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কার্যক্রম চাই। পাশাপাশি আসে সহিংসতার প্রতিকারের চ্যালেঞ্জ।

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে চায়। এসডিজির পঞ্চম লক্ষ্য, নারী ও কন্যাশিশুর সমতা অর্জন এবং নারীর ক্ষমতায়ন। আর ১৬তম লক্ষ্য শিশুদের ওপর অত্যাচার, শোষণ, পাচার এবং সব ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতন বন্ধ করা।

ঘরে-বাইরে, যৌন ও শারীরিক

গত পাঁচ বছরে (২০১৪-১৮) ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা এবং ধর্ষণজনিত হত্যার শিকার হয়েছে অন্তত প্রায় ৪ হাজার নারী ও শিশু। নিজস্ব তদন্ত ও আটটি জাতীয় দৈনিকের প্রকাশিত তথ্য সংকলন করে এ হিসাব দিচ্ছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।

ভুক্তভোগীদের যাদের বয়স জানা যায়, তাদের ৮৬ শতাংশই শিশু অথবা সদ্য প্রাপ্তবয়স্ক তরুণী। ধর্ষণজনিত হত্যার শিকার নারীরও প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এই বয়সী।

এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, পাঁচ বছরে ১৯ হাজারের বেশি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নারী সহায়তা ও তদন্ত বিভাগের কাছে ঢাকার ৫০ থানার জটিল ও সংবেদনশীল মামলা আসে। এ বিভাগের দায়িত্বে থাকা ডিএমপির উপকমিশনার ফরিদা ইয়াসমীন বলছেন, তাঁরা ধর্ষণের মামলা বেশি পান। তবে ঘটনার তুলনায় মামলা হয় কম।

এদিকে নারী নির্যাতন নিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৫ সালের জরিপটি (ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন সার্ভে) বলছে, বিয়ের অভিজ্ঞতা আছে এমন নারীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জীবনকালে স্বামীর হাতে অন্তত একবার কোনো না কোনো নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছির ক্ষেত্রে এটা ছিল যৌন নির্যাতন।

নারীদের প্রায় অর্ধেক স্বামীর হাতে শারীরিক নির্যাতনের কথা বলেছেন। স্বামীর হাতে মানসিক নির্যাতন ও অর্থনৈতিক শোষণের কথা বলেছেন আরও বেশি নারী। জরিপ বলছে, স্বামীর নির্যাতনের শিকার নারীদের তিন-চতুর্থাংশ এসব কথা কাউকে বলেন না। আর মামলা করেন মাত্র ৩ শতাংশ।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অথবা দণ্ডবিধি স্বামীর হাতে ধর্ষণের বিষয়টি প্রায় আমলেই নেয় না। ২০১০ সালে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষার একটি আইন হয়েছে। আইনটির উদ্দেশ্য, পরিবারভুক্ত সব নারী ও শিশুকে পারিবারিক পরিসরে শারীরিক, মানসিক, যৌন এবং অর্থনৈতিক নির্যাতন থেকে সুরক্ষা দেওয়া।

কিন্তু আইনটির প্রয়োগ হচ্ছে না, বললেন সামাজিক আন্দোলন আমরাই পারি ক্যাম্পেইনের সহসভাপতি এম বি আখতার। তাঁদের হিসাবে, গত বছর পর্যন্ত এ আইনে মাত্র তিন হাজার মামলা দায়ের হয়েছে। আইনটি প্রয়োগের জন্য পর্যাপ্ত সংবেদনশীল ও দক্ষ পুলিশ বা সমাজসেবা কর্মকর্তা নেই। আইনেও ঘাটতি আছে।

যৌন সহিংসতা-হয়রানির জের

যাত্রাপথে যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ ও গণধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে। গত বছর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, গণপরিবহনে চলাচলকারী নারীদের ৯৪ শতাংশ কোনো না কোনো সময় মৌখিক, শারীরিক ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

যৌন হয়রানি বা নিরাপত্তাহীন যাতায়াত শিশু ও নারীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা কাজে যাওয়া থামিয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি ২০১৫ সালে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি পরিস্থিতির ওপর একটি জরিপ চালিয়েছিল। উত্তরদাতাদের ৮৪ শতাংশ বলেছিলেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়।

বাল্যবিবাহ

বিবিএস ও ইউনিসেফের একটি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে দেশে বাল্যবিবাহের হার ছিল ৬৪ শতাংশ। ২০১৪ সালে সেটা ৫২ শতাংশে নেমে এসেছে।

ইউনিসেফের শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ শাবনাজ জাহেরীন প্রথম আলোকে বলেন, বাল্যবিবাহ কমার প্রবণতাকে খুব বেশি আশাব্যঞ্জক বলা যাচ্ছে না।

শাবনাজ বলেন, বাল্যবিবাহের সঙ্গে নিরাপত্তার অভাব ও দারিদ্র্যসহ অনেক বিষয় জড়িত। সরকার মেয়েদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিনা মূল্যে পড়ার সুযোগ দিচ্ছে। কিন্তু স্কুল-কলেজে যাওয়ার পথ নিরাপদ নয়। ফলে অভিভাবকেরা মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছেন।

সরকার ২০১৭ সালে পুরোনো বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনটি বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়ন করেছে। বিধিমালা ও কর্মকৌশলও তৈরি হয়েছে। তবে নতুন আইনে কিছু শর্ত সাপেক্ষে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়েকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ের উন্নয়নকর্মীরা বলছেন, এ বিধান জটিলতা বাড়াচ্ছে।

যৌতুক, অ্যাসিড-সন্ত্রাস

আসকের হিসাবে গত পাঁচ বছরে যৌতুকের দাবিতে সহিংসতার শিকার হয়েছেন ১ হাজারের কিছু বেশি নারী। এঁদের অর্ধেকের বেশি নারীকে হত্যা করা হয়।

অ্যাসিড-সন্ত্রাসের প্রধান শিকার নারী ও শিশুরা। অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন (এএসএফ) ও প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সংস্থার সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ফলে অ্যাসিড-সন্ত্রাস কমেছে। তবে একেবারে বন্ধ হয়নি।

এএসএফের তথ্য বলছে, ২০০২-০৩ সালের দিকে বছরে প্রায় ৫০০ জন অ্যাসিডদগ্ধ হতেন। গত বছর সংখ্যাটি ২২-এ নেমে এসেছে।

শিশুর বিশেষ ঝুঁকি

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে গত পাঁচ বছরে প্রায় ১ হাজার ৭০০ শিশু হত্যার হিসাব দিচ্ছে। হত্যার কারণগুলোর মধ্যে আছে ধর্ষণ, অপহরণ, নিখোঁজ হওয়া, বাবা-মায়ের কলহ ও পিটুনি। আছে গৃহকর্মী হত্যা বা রাজনৈতিক সহিংসতায় হত্যা।

শিশুর সুরক্ষায় বড় বাধা হয়ে আছে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম। বিবিএসের সর্বশেষ জাতীয় শিশুশ্রম সমীক্ষা (২০১৩) বলছে, প্রায় ১৩ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত আছে। ২০০৩ সালের জরিপটিতে এমন শিশুর সংখ্যা মাত্র ১১ হাজার বেশি ছিল।

২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিশুশ্রম নির্মূল নীতিমালায় সরকার বলেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে। সরকারের করা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের তালিকা নিয়েই অবশ্য অধিকারকর্মীদের মধ্যে বিতর্ক আছে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের বিভাগীয় পরিচালক আবদুল্লা আল মামুন যেমন বললেন, তালিকায় গৃহশ্রম নেই। অথচ মেয়ে শিশুদের জন্য বাসাবাড়িতে কাজ করা খুব ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রতিকার ও প্রতিরোধ

আওয়ামী লীগের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী ইশতেহারে নারী নির্যাতন বন্ধে আইন বা আইনের প্রয়োগ-সংক্রান্ত কোনো অঙ্গীকার নেই। তবে তার আগের দুটি নির্বাচনী ইশতেহারে দলটি এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে করা মামলাগুলোর বিচার হয় বিশেষ আদালতে। প্রথম আলো ছয়টি অপরাধে ঢাকা জেলার বিশেষ আদালতগুলোয় আসা ৮ হাজারের কাছাকাছি মামলার বিচার-পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেছে। অপরাধগুলো হচ্ছে, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের জন্য হত্যা, যৌতুকের জন্য হত্যা, আত্মহত্যায় প্ররোচনা আর যৌন পীড়ন।

২০০২ থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১৫ বছরে মামলাগুলো আদালতে এসেছিল। অর্ধেকের কিছু বেশি মামলা নিষ্পন্ন হয়েছিল। সাজা হয় তার মাত্র ৩ শতাংশ মামলায়।

প্রথম আলোর অনুসন্ধান তদন্তে অবহেলা-অদক্ষতা, মামলা পরিচালনায় গাফিলতি, দীর্ঘসূত্রতাসহ দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছিল। নানা পক্ষের উদ্যোগে আসামির সঙ্গে আপসরফা হওয়া ছিল একটি বড় সমস্যা।

ফাহমিদা আক্তার নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের জন্য পরিচালিত সরকারের ঢাকার ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারটির (ওসিসি) আইনজীবী। তিনি বলছেন, আপসরফার কারণগুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না জোগালে তারা বিচার বা প্রতিকারের জন্য লেগে থাকতে পারে না। এমন সহযোগিতা বা পুনর্বাসনের সুযোগ এখন খুব সীমিত। সরকারের একটি হেল্পলাইন ও একটি মোবাইল অ্যাপ আছে। তবে এগুলোর কার্যকারিতা যথেষ্ট না। ভুক্তভোগীদের জন্য নিরাপদ আবাসনও খুবই অপ্রতুল।

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারের বিশেষ কর্মসূচির প্রকল্প পরিচালক আবুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সরকার নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০১৮-৩০) প্রণয়ন করছে। এর আওতায় প্রয়েজনীয় কাজগুলো করার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বাজেট বরাদ্দ পাবে।

সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলের লক্ষ্যে কাজ করা জরুরি। নারীর অবস্থান শক্তিশালী করা জরুরি। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, সমাজের মনন বদলের জন্য বিনিয়োগ দরকার। প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে। রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজে নারীকে ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি ও সম্মান দিতে হবে।

অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রথম আলোকে বলেন, খাদ্য-পুষ্টির অভাবসহ যেকোনো বিরূপ পরিবেশ-পরিস্থিতি নারী ও শিশুর বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করলে সেটাও নির্যাতন-সহিংসতা হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। রাষ্ট্রকে সব কটি বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে সরকার শুধু নয়, এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবার অংশগ্রহণ চাই।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন